দহন শেষে প্রেম - তৃতীয় অধ্যায়
━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━
তৃতীয় অধ্যায় : ছায়ার আড়ালে দহন
লেখনীতে: আব্দুল্লাহ আল মিজান
━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━
কিছু মানুষ তোমাকে বাঁচায়।
কিন্তু বাঁচাতে বাঁচাতে এমনভাবে জড়িয়ে ফেলে
যে একদিন বুঝতেও পারো না —
তুমি মুক্ত, নাকি আরও গভীর বন্দি?
(#পর্ব_১০) — ল্যাবের প্রথম সকাল
সকালের প্রথম আলো এখানে ঢোকে না।
এই ল্যাবরেটরিতে কৃত্রিম আলো — শীতল, সাদা, নির্মম। যেন এখানে আলো শুধু দেখার জন্য, উষ্ণতার জন্য নয়। চারদিকে রুপালি ইস্পাতের নিস্তব্ধতা। বায়োমেট্রিক লক, সেন্সর, ক্যামেরা।
রুহি আয়নার সামনে দাঁড়াল।
নিজের দিকে তাকাল।
চোখের নিচে কালি পড়েছে। চুল অবিন্যস্ত। কিন্তু চোখে — চোখে সেই একই আগুন।
সে আয়নায় নিজেকে বলল — "এই ল্যাব শুধু বিজ্ঞানের জায়গা নয়। প্রতিটি দেয়ালের আড়ালে বিশ বছরের এক পচা ইতিহাস। আমি এসেছি সেই ইতিহাস খুঁজতে।"
দরজার যান্ত্রিক শব্দ।
(#পর্ব_১১) — ফাইল
আদিয়ান ঢুকল।
আজ তার হাতে একটা ফাইল। এবং চোখে সেই আগের শীতলতা নেই — বা আছে, কিন্তু তার নিচে আরো কিছু।
সে ফাইলটা রাখল। রুহির একটু বেশিই কাছে।
রুহি ফাইল খুলল।
বাবার সম্পূর্ণ মেডিকেল রিপোর্ট।
"আপনি এটা কখন করলেন?
"গতকাল রাতে।"
রুহি উপর তাকাল।
গতকাল রাতে চুক্তি হয়েছে। আজ সকালেই এই ফাইল।
আদিয়ান রুহির সেই দৃষ্টি দেখে ঠোঁটের কোণে একটু হাসি।
সেই হাসিটা এত বিরল যে রুহির বুকের ভেতর কোথাও একটা টান লাগল।
সে তাড়াতাড়ি চোখ নামাল।
"যখন যা লাগবে বলো।"
আদিয়ান চলে যেতে গেল।
মিস্টার খান....
থামল।
"আপনি কেন এত করছেন?"
নিস্তব্ধতা।
আদিয়ান ঘুরল না। পেছন থেকে বলল, "কারণ এটা আমার দায়।"
"কীসের দায়?"
জবাব নেই। চলে গেল।
রুহি সেই শূন্য দরজার দিকে তাকিয়ে রইল।
এই মানুষটাকে সে বুঝতে পারে না। তার চোখে মাঝে মাঝে এমন কিছু দেখা যায় যা রুহিকে বিভ্রান্ত করে।
সে মাথা ঝাঁকাল। ল্যাপটপ খুলল।
কাজ।
---
(#পর্ব_১২) — এনক্রিপটেড সত্য
কাজের গভীরে।
তারপর হঠাৎ রুহির স্ক্রিনে একটা এনক্রিপটেড ফোল্ডার ভেসে উঠলো।
সাধারণ নয়। লুকানো। যেন কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে পুঁতে রেখেছে — কারো জন্য।
রুহির আঙুলগুলো কিবোর্ডের উপর থামল।
সে কোড ভাঙতে শুরু করল।
দশ মিনিট। বিশ মিনিট। ত্রিশ মিনিট।
অনেক চেষ্টার পর ফোল্ডার খুলল।
ভেতরে একটা ভিডিও।
রুহি স্বাভাবিক ভাবে চালাল।
স্ক্রিনে — এক বৃষ্টির রাত। একটা বিশাল ঘরের ডাইনিং টেবিল। দুজন মানুষ। হাসছেন। কফি খাচ্ছেন।
একজন — রহমত উল্লাহ। তরুণ বয়সে। সেই পরিচিত মুখ, কিন্তু চোখে তখন অনেক আলো।
অন্যজন — আফজাল খান।
রুহির হাতের আঙুলগুলো টেবিলের উপর চেপে বসল।
ভিডিও এগিয়ে গেল।
রাত গভীর হলো। রহমত উল্লাহ ঘুমিয়ে পড়লেন।
আফজাল খান উঠলেন।
পকেটে হাত গেল।
রুহির নিঃশ্বাস একটু থামল।
বাবার ঘাড়ে সেই সিরিঞ্জ।
বাবা একবার ছটফট করলেন। তারপর স্থির।
আফজাল খান একটি ফাইল নিলেন। ব্যাগে ভরলেন। নিশ্চিন্তে বেরিয়ে গেলেন।
ভিডিও শেষ।
রুহি নড়তে পারছে না।
তারপর — তার একটা হাত মুখের উপর উঠে গেল।
কিছু না। কোনো শব্দ না।
শুধু কাঁধ কাঁপছে।
বিশ বছর।
বিশ বছর ধরে বাবা এই বিষ বহন করে বেড়াচ্ছেন। মা রাতে ঘুমাতে পারেন না। তুলি বড় হয়েছে এক ছায়াবৃত বাড়িতে।
রুহি অনেকক্ষণ বসে রইল।
তারপর হাত সরাল।
চোখ মুছল।
সোজা হয়ে বসল।
তার চোখে এখন কান্না নেই।
আছে এক শীতল, অটল সংকল্প।
সে ভিডিওর কপি এনক্রিপট করে নিজের ক্লাউডে পাঠাল।
তারপর ফোল্ডারের নামটা আবার দেখল।
The Nebula-001
এই নামটা সে কোথাও দেখেছে। বাবার পুরনো ডায়েরিতে। 'নেবুলা' নামের একটি আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক — বিজ্ঞানকে ক্ষমতার অস্ত্র হতে বাধা দেওয়ার জন্য তৈরি।
তাহলে এই ফোল্ডার এখানে কীভাবে এলো?
এই প্রশ্নের উত্তর এখনই নেই।
কিন্তু প্রশ্নটা রয়ে গেল।
---
(#পর্ব_১৩) — আদিয়ানের রাত
সেই রাতে আদিয়ান ভবনের উপরের বারান্দায়।
নিচে শহর জেগে আছে। আলো আর অন্ধকারের মিশেল।
রাশিয়ার একটি নম্বর থেকে কল আসছে। সে কাটল।
জেনেভার একটি নম্বর। কাটল।
আজ রাতে সে কথা বলতে চাইছে না।
সে রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে রইল।
এ কয়েক দিন ধরে সে দুটো জীবনে বেঁচে আছে।
একটিতে — পৃথিবীর অনেক দেশের গোপন তথ্য যার কাছে আছে, যার একটি সিদ্ধান্তে অনেক কিছু বদলে যায়।
যার ইচ্ছের বিরুদ্ধে গেলে, যে কাউ কে ধ্বংস করে দিতে দ্বিতীয় বার ভাবে না
আরেকটিতে — একটি ছেলে। যে তার মাকে হারিয়েছে। যার বাবা তাকে ব্যবহার করেছেন, ভালোবাসেননি। যে শক্তিশালী হয়েছে বাঁচার জন্য।
এই দুই সত্তার মাঝখানে একটা মানুষ আছে।
সেই মানুষটার নাম কেউ জানে না।
আজ পর্যন্ত।
কিন্তু আজ — রুহির সেই কাঁপা কাঁধ মনে পড়ছে — সেই লুকানো মানুষটা নাড়া খাচ্ছে।
মায়ের কথা মনে পড়ল।
"তুমি তোমার বাবা দাদার মতো হবে না, আদিয়ান। কারণ তোমার বুকে এখনো মানুষের জন্য ব্যথা আছে।"
তখন বিশ্বাস করেনি।
আজ — রুহির সেই চোখের জল মনে পড়লে — হয়তো একটু বুঝছে।
---
(#পর্ব_১৪) — দুটো মানুষ, একটা জানালা
পরদিন বিকেলে।
ল্যাবের বড় কাচের জানালার সামনে রুহি দাঁড়িয়ে।
বাইরে শহর। কিন্তু এই কাচের ভেতর থেকে দেখলে সব দূরের মনে হয়।
পদশব্দ শুনল।
তার কান পরিচিত এই পদশব্দ — অন্য সবার চেয়ে আলাদা।
আদিয়ান পাশে এসে দাঁড়াল। কিছু বলল না। শুধু বাইরে তাকাল।
দুজন পাশাপাশি। একটু দূরত্ব। কিন্তু সেই দূরত্বে একটা টান।
রুহি সেই টান অনুভব করল।
সরিয়ে দিল।
"আপনি কেন এত করছেন? এই ল্যাব, বাবার চিকিৎসা — সত্যিকারের কারণটা কী?"
"পাপ আমার বাবার। ক্ষতি তোমার পরিবারের। দায়টা এই বংশের।"
"আপনি কি কখনো অনুতাপ করেন?"
দীর্ঘ নিস্তব্ধতা।
আদিয়ান জানালার বাইরে তাকাল।
তারপর ঘুরল।
তার চোখে এবার সেই পাথুরে দৃষ্টি নেই।
আছে এমন কিছু — যা রুহি আগে কখনো দেখেনি। কোনো ব্যাখ্যা নেই সেটার।
সে কিছু বলল না।
কিন্তু সেই না-বলার ভেতরেই উত্তর ছিল।
রুহির বুকে কোথাও একটা কাঁপন উঠল।
সে তাড়াতাড়ি চোখ সরাল।
"আমার কাজে যাওয়া দরকার।"
সে সরে গেল।
আদিয়ান জানালার সামনে একা।
নিজেকে প্রশ্ন করল — অনুতাপ করি কি না?
জানে না।
কিন্তু এটুকু জানে — রুহির সামনে দাঁড়িয়ে সে যেটা অনুভব করে, সেটা তার কাছে নতুন।
এবং নতুন জিনিস সবসময় ভয়ের।
---
(#পর্ব_১৫) — জ্যাকেট
কয়েকদিন পরে।
রুহি কাজ করতে করতে টেবিলেই ঘুমিয়ে পড়েছিল।
আদিয়ান ঘরে ঢুকে দেখল।
রুহিকে এভাবে দেখেনি কখনো। সেই জেদ নেই, সেই আগুন নেই। শুধু একটা ক্লান্ত মানুষ।
আদিয়ান তার জ্যাকেটটা খুলল।
ধীরে রুহির কাঁধে রাখল।
এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর বেরিয়ে গেল।
রুহি জেগে উঠল।
কাঁধে জ্যাকেট।
কার — বুঝল।
সে জ্যাকেটটা হাতে নিল। তারপর আবার কাঁধে রাখল।
ভাঁজ করল না।
একটু পরে ভাঁজ করল।
তারপর আবার সরিয়ে রাখল।
মনে মনে বলল — এটা কিছু না।
কিন্তু সারাদিন সেই উষ্ণতাটা রয়ে গেল।
-
আরেকদিন সন্ধ্যায়।
ল্যাবের বারান্দায়। আকাশ লাল হয়ে আসছে।
আদিয়ান এলো। পাশে দাঁড়াল।
"আপনার মা কেমন ছিলেন?"
আদিয়ান একটু থামল। তারপর বলল, "উষ্ণ। এই বাড়িতে সবচেয়ে বেশি উষ্ণ মানুষ।"
"তাহলে আপনি কার মতো?"
আদিয়ান একটু হাসল।
সেই বিরল হাসি। যা দেখলে মনে হয় — এই মানুষটার ভেতরে আরেকটা মানুষ আছে।
"এখনো বুঝে উঠিনি।"
রুহি সূর্যাস্তের দিকে তাকাল। "আমার বাবা বলতেন — মানুষ তার মতো হয়, যাকে সে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে। আপনার মা যদি উষ্ণ ছিলেন — তাহলে সেটা আপনার ভেতরেও আছে। শুধু বের হতে পারছে না।"
আদিয়ান তার দিকে তাকাল।
এই মেয়ে তাকে এমন কিছু বলছে যা আগে কেউ বলেনি।
এবং তার বুকের ভেতর — ঠিক সেই জায়গায় যেখানে লাইব্রেরিতে প্রথম একটা সংকোচন হয়েছিল — আবার কিছু একটা নড়ল।
---
(#পর্ব_১৬) — আরাত্রিকা
কিছুদিন পরে।
দেশের গুরুত্বপূর্ণ নেতার বিশাল ভবনের একটি মিটিং রুমে।
আদিয়ান কাজ করছিল।
দরজায় টোকা।
"আসুন।"
দরজা খুলল।
আরাত্রিকা।
সে এই বাড়িতে আসে মাঝে মাঝে — তার বাবার কাজে। কিন্তু আজ তার পিঠ সোজা নয়। হাত দুটো পরস্পরের উপর। চোখ নামানো।
আদিয়ান তার দিকে তাকাল।
"আরাত্রিকা।"
সে মাথা তুলল।
তার চোখে — এত কিছু। ভয়, আবেদন, এবং এমন কিছু যা সে বলতে পারছে না।
"আমি জানি তুমি ব্যস্ত।"
"বলো।"
সে এগিয়ে এল। টেবিলের কাছে দাঁড়াল।
"আদিয়ান।" তার কণ্ঠ নরম। "আমি তোমাকে অনেক বছর ধরে চিনি।"
"হ্যাঁ।"
একটা কথা তোমাকে অনেক দিন থেকে বলতে চাচ্ছি কিন্তু বলা হয়নি।
"আমি তোমাকে ভালোবাসি।
অনেক ভালোবাসি।
ঘরে নিস্তব্ধতা নামল।
কিন্তু আদিয়ানের মুখে কোন ভাবান্তর নাই
আরাত্রিকা চোখ তুলল। সেই চোখে এখন কোনো আবরণ নেই।
"আমি জানি তুমি অনুভব করো না। কিন্তু আমি তোমাকে বলতে চেয়েছিলাম। অনেকদিন ধরে।"
আদিয়ান উঠে দাঁড়াল।
সে জানালার দিকে গেল। পিঠ আরাত্রিকার দিকে।
অনেকক্ষণ চুপ।
তারপর ঘুরল।
"আরাত্রিকা।" তার কণ্ঠ শান্ত, কিন্তু সৎ। "তুমি যা অনুভব করো সেটা সত্যি। কিন্তু আমি তোমাকে মিথ্যা আশা দিলে তোমার ক্ষতি হবে।"
তার চোখ একটু ভিজল।
"কেন?"
আদিয়ান সরাসরি তার চোখে তাকাল।
"কারণ আমার হৃদয়ে যেখানে তোমার নাম লেখার কথা ছিল — সেখানে অন্য কারো ছায়া পড়েছে।"
সে একটু মাথা নামাল।
তারপর ঘুরে চলে গেল।
কারণ সে আদিয়ান কে শান্ত রাখতে চায় রাগাতে চায় না.
দরজা বন্ধ হলো।
আরাত্রিকা যখন আদিয়ানের রুম থেকে বেরিয়ে আসছিল, তখন তার চেহারায় কান্নার চেয়ে বেশি ছিল এক ধরণের কঠিন সংকল্প। করিডোর দিয়ে যাওয়ার সময় তার দেখা হলো রুহির সাথে।
রুহি আদিয়ানের সাথেই আসছিলো বাহিরে হাঁটাহাটি করে ফিরছিল। আরাত্রিকা এক মুহূর্তের জন্য থামল। সে রুহিকে ওপর-নিচ একবার দেখল— রুহির সেই সাধারণ সাদা ল্যাব কোট, কপালের ওপর অবাধ্য চুল আর চোখের সেই অদম্য জেদ।
আরাত্রিকার ঠোঁটের কোণে একটা বিষাক্ত হাসি ফুটে উঠল। সে বিড়বিড় করে বলল, "আদিয়ানের হৃদয়ে ছায়া ফেলার অধিকার সবার থাকে না, রুহি। যে ছায়া অন্ধকার থেকে আসে, তাকে অন্ধকারেই মিশিয়ে দিতে হয়।"
রুহি কিছু বলতে চাইল, কিন্তু আরাত্রিকা তাকে কোনো সুযোগ না দিয়েই পাশ কাটিয়ে চলে গেল। তার পারফিউমের কড়া ঘ্রাণটা করিডোরে বিষাক্ত এক রেশ রেখে গেল।
রুহি একবার পেছন ফিরে তাকাল। তার মনে হলো, সামনে যে লড়াই আসছে তা কেবল গবেষণার নয়, বরং এক অদৃশ্য প্রতিহিংসার।
আদিয়ান জানালার দিকে ফিরল।
বাইরে শহর।
তার বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত শান্তি — এবং একটা অদ্ভুত অশান্তি।
একসাথে।
---
(#পর্ব_১৭) — করিডোরের অন্ধকার
একদিন বিকেলে।
রুহি করিডোর দিয়ে হাঁটছিল।
তখন পাশের একটা কক্ষের দরজা সামান্য ফাঁক।
ভেতর থেকে কণ্ঠস্বর।
আফজাল খান।
রুহির পা থামল।
এত দিন কেন লাগছে, মেয়েটাকে ঠিকঠাক ব্যবহার করো। ফর্মুলা বের করো। রাজি না হলে তার মা আর বোনকে...
রুহির সারা শরীরে একটা শীত নামল।
তার হাত দেয়ালে গিয়ে পড়ল।
মা। তুলি।
সে দাঁত কামড়ে ধরল। তার পা কাঁপছে — কিন্তু সে দেয়াল থেকে হাত সরাল। পিঠ সোজা করল।
করিডোরের অন্য প্রান্তে অন্ধকারে কেউ দাঁড়িয়ে।
আদিয়ান।
সেও শুনেছে।
তার হাতে একটা দামী কলম ছিল — যা মুচড়ে গেছে। ভেঙে দুই টুকরো।
তার চোখে যা আছে তা রাগ নয়। তার চেয়ে গভীর কিছু।
আদিয়ান রুহির দিকে তাকাল।
রুহির পিঠ সোজা। কাঁধ শক্ত।
সে ভাঙেনি। তবে মা- বোন কে নিয়েও এখন টেনশন হচ্ছে।
আদিয়ানের বুকের ভেতর সেই চেনা সংকোচন আরো তীব্র হলো।
অন্ধকারে মনে মনে বলল —
বিষাক্ত এই পৃথিবীতে তোকে আড়াল করার দায় আজ আমার।
পুড়ুক এই শহর — তবুও তুই থাকবি আমার ছায়াতে।
রুহি ঘুরল না।
কিন্তু অনুভব করল — সে একা নয়।
ল্যাবে ফেরার পথে আদিয়ান তার পাশে হাঁটল।
দরজায় এসে রুহি থামল। ঘুরল।
"আপনার বাবা আমার পরিবারকে হুমকি দিয়েছেন।"
"জানি।"
"তাহলে?"
আদিয়ান খুব কাছে এল।
রুহির চোখে সরাসরি তাকাল।
"তোমার পরিবারের কিছু হবে না। এই কথা আমি দিচ্ছি।"
রুহি তার চোখে সত্য খুঁজল।
"আদিয়ান খানের কথা বিশ্বাস করা যায়?"
সে অদ্ভুত নরম গলায় বলল — "আমার অনেক কিছুই বিশ্বাসযোগ্য নয়। কিন্তু যখন কাউকে রক্ষা করার কথা বলি — সেটা রাখি।"
সে চলে গেল।
রুহি একা।
বাইরে শহর। ভেতরে দুটো মানুষের দুটো দহন।
একটা — ঘৃণা আর ভালোবাসার মাঝখানে।
আরেকটা — অন্ধকার আর আলোর মাঝখানে।
মেলার পথ তৈরি হচ্ছে।
ধীরে। অনিবার্যভাবে।
[ চলবে ]
তৃতীয় অধ্যায় : ছায়ার আড়ালে দহন
লেখনীতে: আব্দুল্লাহ আল মিজান
━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━
কিছু মানুষ তোমাকে বাঁচায়।
কিন্তু বাঁচাতে বাঁচাতে এমনভাবে জড়িয়ে ফেলে
যে একদিন বুঝতেও পারো না —
তুমি মুক্ত, নাকি আরও গভীর বন্দি?
(#পর্ব_১০) — ল্যাবের প্রথম সকাল
সকালের প্রথম আলো এখানে ঢোকে না।
এই ল্যাবরেটরিতে কৃত্রিম আলো — শীতল, সাদা, নির্মম। যেন এখানে আলো শুধু দেখার জন্য, উষ্ণতার জন্য নয়। চারদিকে রুপালি ইস্পাতের নিস্তব্ধতা। বায়োমেট্রিক লক, সেন্সর, ক্যামেরা।
রুহি আয়নার সামনে দাঁড়াল।
নিজের দিকে তাকাল।
চোখের নিচে কালি পড়েছে। চুল অবিন্যস্ত। কিন্তু চোখে — চোখে সেই একই আগুন।
সে আয়নায় নিজেকে বলল — "এই ল্যাব শুধু বিজ্ঞানের জায়গা নয়। প্রতিটি দেয়ালের আড়ালে বিশ বছরের এক পচা ইতিহাস। আমি এসেছি সেই ইতিহাস খুঁজতে।"
দরজার যান্ত্রিক শব্দ।
(#পর্ব_১১) — ফাইল
আদিয়ান ঢুকল।
আজ তার হাতে একটা ফাইল। এবং চোখে সেই আগের শীতলতা নেই — বা আছে, কিন্তু তার নিচে আরো কিছু।
সে ফাইলটা রাখল। রুহির একটু বেশিই কাছে।
রুহি ফাইল খুলল।
বাবার সম্পূর্ণ মেডিকেল রিপোর্ট।
"আপনি এটা কখন করলেন?
"গতকাল রাতে।"
রুহি উপর তাকাল।
গতকাল রাতে চুক্তি হয়েছে। আজ সকালেই এই ফাইল।
আদিয়ান রুহির সেই দৃষ্টি দেখে ঠোঁটের কোণে একটু হাসি।
সেই হাসিটা এত বিরল যে রুহির বুকের ভেতর কোথাও একটা টান লাগল।
সে তাড়াতাড়ি চোখ নামাল।
"যখন যা লাগবে বলো।"
আদিয়ান চলে যেতে গেল।
মিস্টার খান....
থামল।
"আপনি কেন এত করছেন?"
নিস্তব্ধতা।
আদিয়ান ঘুরল না। পেছন থেকে বলল, "কারণ এটা আমার দায়।"
"কীসের দায়?"
জবাব নেই। চলে গেল।
রুহি সেই শূন্য দরজার দিকে তাকিয়ে রইল।
এই মানুষটাকে সে বুঝতে পারে না। তার চোখে মাঝে মাঝে এমন কিছু দেখা যায় যা রুহিকে বিভ্রান্ত করে।
সে মাথা ঝাঁকাল। ল্যাপটপ খুলল।
কাজ।
---
(#পর্ব_১২) — এনক্রিপটেড সত্য
কাজের গভীরে।
তারপর হঠাৎ রুহির স্ক্রিনে একটা এনক্রিপটেড ফোল্ডার ভেসে উঠলো।
সাধারণ নয়। লুকানো। যেন কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে পুঁতে রেখেছে — কারো জন্য।
রুহির আঙুলগুলো কিবোর্ডের উপর থামল।
সে কোড ভাঙতে শুরু করল।
দশ মিনিট। বিশ মিনিট। ত্রিশ মিনিট।
অনেক চেষ্টার পর ফোল্ডার খুলল।
ভেতরে একটা ভিডিও।
রুহি স্বাভাবিক ভাবে চালাল।
স্ক্রিনে — এক বৃষ্টির রাত। একটা বিশাল ঘরের ডাইনিং টেবিল। দুজন মানুষ। হাসছেন। কফি খাচ্ছেন।
একজন — রহমত উল্লাহ। তরুণ বয়সে। সেই পরিচিত মুখ, কিন্তু চোখে তখন অনেক আলো।
অন্যজন — আফজাল খান।
রুহির হাতের আঙুলগুলো টেবিলের উপর চেপে বসল।
ভিডিও এগিয়ে গেল।
রাত গভীর হলো। রহমত উল্লাহ ঘুমিয়ে পড়লেন।
আফজাল খান উঠলেন।
পকেটে হাত গেল।
রুহির নিঃশ্বাস একটু থামল।
বাবার ঘাড়ে সেই সিরিঞ্জ।
বাবা একবার ছটফট করলেন। তারপর স্থির।
আফজাল খান একটি ফাইল নিলেন। ব্যাগে ভরলেন। নিশ্চিন্তে বেরিয়ে গেলেন।
ভিডিও শেষ।
রুহি নড়তে পারছে না।
তারপর — তার একটা হাত মুখের উপর উঠে গেল।
কিছু না। কোনো শব্দ না।
শুধু কাঁধ কাঁপছে।
বিশ বছর।
বিশ বছর ধরে বাবা এই বিষ বহন করে বেড়াচ্ছেন। মা রাতে ঘুমাতে পারেন না। তুলি বড় হয়েছে এক ছায়াবৃত বাড়িতে।
রুহি অনেকক্ষণ বসে রইল।
তারপর হাত সরাল।
চোখ মুছল।
সোজা হয়ে বসল।
তার চোখে এখন কান্না নেই।
আছে এক শীতল, অটল সংকল্প।
সে ভিডিওর কপি এনক্রিপট করে নিজের ক্লাউডে পাঠাল।
তারপর ফোল্ডারের নামটা আবার দেখল।
The Nebula-001
এই নামটা সে কোথাও দেখেছে। বাবার পুরনো ডায়েরিতে। 'নেবুলা' নামের একটি আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক — বিজ্ঞানকে ক্ষমতার অস্ত্র হতে বাধা দেওয়ার জন্য তৈরি।
তাহলে এই ফোল্ডার এখানে কীভাবে এলো?
এই প্রশ্নের উত্তর এখনই নেই।
কিন্তু প্রশ্নটা রয়ে গেল।
---
(#পর্ব_১৩) — আদিয়ানের রাত
সেই রাতে আদিয়ান ভবনের উপরের বারান্দায়।
নিচে শহর জেগে আছে। আলো আর অন্ধকারের মিশেল।
রাশিয়ার একটি নম্বর থেকে কল আসছে। সে কাটল।
জেনেভার একটি নম্বর। কাটল।
আজ রাতে সে কথা বলতে চাইছে না।
সে রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে রইল।
এ কয়েক দিন ধরে সে দুটো জীবনে বেঁচে আছে।
একটিতে — পৃথিবীর অনেক দেশের গোপন তথ্য যার কাছে আছে, যার একটি সিদ্ধান্তে অনেক কিছু বদলে যায়।
যার ইচ্ছের বিরুদ্ধে গেলে, যে কাউ কে ধ্বংস করে দিতে দ্বিতীয় বার ভাবে না
আরেকটিতে — একটি ছেলে। যে তার মাকে হারিয়েছে। যার বাবা তাকে ব্যবহার করেছেন, ভালোবাসেননি। যে শক্তিশালী হয়েছে বাঁচার জন্য।
এই দুই সত্তার মাঝখানে একটা মানুষ আছে।
সেই মানুষটার নাম কেউ জানে না।
আজ পর্যন্ত।
কিন্তু আজ — রুহির সেই কাঁপা কাঁধ মনে পড়ছে — সেই লুকানো মানুষটা নাড়া খাচ্ছে।
মায়ের কথা মনে পড়ল।
"তুমি তোমার বাবা দাদার মতো হবে না, আদিয়ান। কারণ তোমার বুকে এখনো মানুষের জন্য ব্যথা আছে।"
তখন বিশ্বাস করেনি।
আজ — রুহির সেই চোখের জল মনে পড়লে — হয়তো একটু বুঝছে।
---
(#পর্ব_১৪) — দুটো মানুষ, একটা জানালা
পরদিন বিকেলে।
ল্যাবের বড় কাচের জানালার সামনে রুহি দাঁড়িয়ে।
বাইরে শহর। কিন্তু এই কাচের ভেতর থেকে দেখলে সব দূরের মনে হয়।
পদশব্দ শুনল।
তার কান পরিচিত এই পদশব্দ — অন্য সবার চেয়ে আলাদা।
আদিয়ান পাশে এসে দাঁড়াল। কিছু বলল না। শুধু বাইরে তাকাল।
দুজন পাশাপাশি। একটু দূরত্ব। কিন্তু সেই দূরত্বে একটা টান।
রুহি সেই টান অনুভব করল।
সরিয়ে দিল।
"আপনি কেন এত করছেন? এই ল্যাব, বাবার চিকিৎসা — সত্যিকারের কারণটা কী?"
"পাপ আমার বাবার। ক্ষতি তোমার পরিবারের। দায়টা এই বংশের।"
"আপনি কি কখনো অনুতাপ করেন?"
দীর্ঘ নিস্তব্ধতা।
আদিয়ান জানালার বাইরে তাকাল।
তারপর ঘুরল।
তার চোখে এবার সেই পাথুরে দৃষ্টি নেই।
আছে এমন কিছু — যা রুহি আগে কখনো দেখেনি। কোনো ব্যাখ্যা নেই সেটার।
সে কিছু বলল না।
কিন্তু সেই না-বলার ভেতরেই উত্তর ছিল।
রুহির বুকে কোথাও একটা কাঁপন উঠল।
সে তাড়াতাড়ি চোখ সরাল।
"আমার কাজে যাওয়া দরকার।"
সে সরে গেল।
আদিয়ান জানালার সামনে একা।
নিজেকে প্রশ্ন করল — অনুতাপ করি কি না?
জানে না।
কিন্তু এটুকু জানে — রুহির সামনে দাঁড়িয়ে সে যেটা অনুভব করে, সেটা তার কাছে নতুন।
এবং নতুন জিনিস সবসময় ভয়ের।
---
(#পর্ব_১৫) — জ্যাকেট
কয়েকদিন পরে।
রুহি কাজ করতে করতে টেবিলেই ঘুমিয়ে পড়েছিল।
আদিয়ান ঘরে ঢুকে দেখল।
রুহিকে এভাবে দেখেনি কখনো। সেই জেদ নেই, সেই আগুন নেই। শুধু একটা ক্লান্ত মানুষ।
আদিয়ান তার জ্যাকেটটা খুলল।
ধীরে রুহির কাঁধে রাখল।
এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর বেরিয়ে গেল।
রুহি জেগে উঠল।
কাঁধে জ্যাকেট।
কার — বুঝল।
সে জ্যাকেটটা হাতে নিল। তারপর আবার কাঁধে রাখল।
ভাঁজ করল না।
একটু পরে ভাঁজ করল।
তারপর আবার সরিয়ে রাখল।
মনে মনে বলল — এটা কিছু না।
কিন্তু সারাদিন সেই উষ্ণতাটা রয়ে গেল।
-
আরেকদিন সন্ধ্যায়।
ল্যাবের বারান্দায়। আকাশ লাল হয়ে আসছে।
আদিয়ান এলো। পাশে দাঁড়াল।
"আপনার মা কেমন ছিলেন?"
আদিয়ান একটু থামল। তারপর বলল, "উষ্ণ। এই বাড়িতে সবচেয়ে বেশি উষ্ণ মানুষ।"
"তাহলে আপনি কার মতো?"
আদিয়ান একটু হাসল।
সেই বিরল হাসি। যা দেখলে মনে হয় — এই মানুষটার ভেতরে আরেকটা মানুষ আছে।
"এখনো বুঝে উঠিনি।"
রুহি সূর্যাস্তের দিকে তাকাল। "আমার বাবা বলতেন — মানুষ তার মতো হয়, যাকে সে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে। আপনার মা যদি উষ্ণ ছিলেন — তাহলে সেটা আপনার ভেতরেও আছে। শুধু বের হতে পারছে না।"
আদিয়ান তার দিকে তাকাল।
এই মেয়ে তাকে এমন কিছু বলছে যা আগে কেউ বলেনি।
এবং তার বুকের ভেতর — ঠিক সেই জায়গায় যেখানে লাইব্রেরিতে প্রথম একটা সংকোচন হয়েছিল — আবার কিছু একটা নড়ল।
---
(#পর্ব_১৬) — আরাত্রিকা
কিছুদিন পরে।
দেশের গুরুত্বপূর্ণ নেতার বিশাল ভবনের একটি মিটিং রুমে।
আদিয়ান কাজ করছিল।
দরজায় টোকা।
"আসুন।"
দরজা খুলল।
আরাত্রিকা।
সে এই বাড়িতে আসে মাঝে মাঝে — তার বাবার কাজে। কিন্তু আজ তার পিঠ সোজা নয়। হাত দুটো পরস্পরের উপর। চোখ নামানো।
আদিয়ান তার দিকে তাকাল।
"আরাত্রিকা।"
সে মাথা তুলল।
তার চোখে — এত কিছু। ভয়, আবেদন, এবং এমন কিছু যা সে বলতে পারছে না।
"আমি জানি তুমি ব্যস্ত।"
"বলো।"
সে এগিয়ে এল। টেবিলের কাছে দাঁড়াল।
"আদিয়ান।" তার কণ্ঠ নরম। "আমি তোমাকে অনেক বছর ধরে চিনি।"
"হ্যাঁ।"
একটা কথা তোমাকে অনেক দিন থেকে বলতে চাচ্ছি কিন্তু বলা হয়নি।
"আমি তোমাকে ভালোবাসি।
অনেক ভালোবাসি।
ঘরে নিস্তব্ধতা নামল।
কিন্তু আদিয়ানের মুখে কোন ভাবান্তর নাই
আরাত্রিকা চোখ তুলল। সেই চোখে এখন কোনো আবরণ নেই।
"আমি জানি তুমি অনুভব করো না। কিন্তু আমি তোমাকে বলতে চেয়েছিলাম। অনেকদিন ধরে।"
আদিয়ান উঠে দাঁড়াল।
সে জানালার দিকে গেল। পিঠ আরাত্রিকার দিকে।
অনেকক্ষণ চুপ।
তারপর ঘুরল।
"আরাত্রিকা।" তার কণ্ঠ শান্ত, কিন্তু সৎ। "তুমি যা অনুভব করো সেটা সত্যি। কিন্তু আমি তোমাকে মিথ্যা আশা দিলে তোমার ক্ষতি হবে।"
তার চোখ একটু ভিজল।
"কেন?"
আদিয়ান সরাসরি তার চোখে তাকাল।
"কারণ আমার হৃদয়ে যেখানে তোমার নাম লেখার কথা ছিল — সেখানে অন্য কারো ছায়া পড়েছে।"
সে একটু মাথা নামাল।
তারপর ঘুরে চলে গেল।
কারণ সে আদিয়ান কে শান্ত রাখতে চায় রাগাতে চায় না.
দরজা বন্ধ হলো।
আরাত্রিকা যখন আদিয়ানের রুম থেকে বেরিয়ে আসছিল, তখন তার চেহারায় কান্নার চেয়ে বেশি ছিল এক ধরণের কঠিন সংকল্প। করিডোর দিয়ে যাওয়ার সময় তার দেখা হলো রুহির সাথে।
রুহি আদিয়ানের সাথেই আসছিলো বাহিরে হাঁটাহাটি করে ফিরছিল। আরাত্রিকা এক মুহূর্তের জন্য থামল। সে রুহিকে ওপর-নিচ একবার দেখল— রুহির সেই সাধারণ সাদা ল্যাব কোট, কপালের ওপর অবাধ্য চুল আর চোখের সেই অদম্য জেদ।
আরাত্রিকার ঠোঁটের কোণে একটা বিষাক্ত হাসি ফুটে উঠল। সে বিড়বিড় করে বলল, "আদিয়ানের হৃদয়ে ছায়া ফেলার অধিকার সবার থাকে না, রুহি। যে ছায়া অন্ধকার থেকে আসে, তাকে অন্ধকারেই মিশিয়ে দিতে হয়।"
রুহি কিছু বলতে চাইল, কিন্তু আরাত্রিকা তাকে কোনো সুযোগ না দিয়েই পাশ কাটিয়ে চলে গেল। তার পারফিউমের কড়া ঘ্রাণটা করিডোরে বিষাক্ত এক রেশ রেখে গেল।
রুহি একবার পেছন ফিরে তাকাল। তার মনে হলো, সামনে যে লড়াই আসছে তা কেবল গবেষণার নয়, বরং এক অদৃশ্য প্রতিহিংসার।
আদিয়ান জানালার দিকে ফিরল।
বাইরে শহর।
তার বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত শান্তি — এবং একটা অদ্ভুত অশান্তি।
একসাথে।
---
(#পর্ব_১৭) — করিডোরের অন্ধকার
একদিন বিকেলে।
রুহি করিডোর দিয়ে হাঁটছিল।
তখন পাশের একটা কক্ষের দরজা সামান্য ফাঁক।
ভেতর থেকে কণ্ঠস্বর।
আফজাল খান।
রুহির পা থামল।
এত দিন কেন লাগছে, মেয়েটাকে ঠিকঠাক ব্যবহার করো। ফর্মুলা বের করো। রাজি না হলে তার মা আর বোনকে...
রুহির সারা শরীরে একটা শীত নামল।
তার হাত দেয়ালে গিয়ে পড়ল।
মা। তুলি।
সে দাঁত কামড়ে ধরল। তার পা কাঁপছে — কিন্তু সে দেয়াল থেকে হাত সরাল। পিঠ সোজা করল।
করিডোরের অন্য প্রান্তে অন্ধকারে কেউ দাঁড়িয়ে।
আদিয়ান।
সেও শুনেছে।
তার হাতে একটা দামী কলম ছিল — যা মুচড়ে গেছে। ভেঙে দুই টুকরো।
তার চোখে যা আছে তা রাগ নয়। তার চেয়ে গভীর কিছু।
আদিয়ান রুহির দিকে তাকাল।
রুহির পিঠ সোজা। কাঁধ শক্ত।
সে ভাঙেনি। তবে মা- বোন কে নিয়েও এখন টেনশন হচ্ছে।
আদিয়ানের বুকের ভেতর সেই চেনা সংকোচন আরো তীব্র হলো।
অন্ধকারে মনে মনে বলল —
বিষাক্ত এই পৃথিবীতে তোকে আড়াল করার দায় আজ আমার।
পুড়ুক এই শহর — তবুও তুই থাকবি আমার ছায়াতে।
রুহি ঘুরল না।
কিন্তু অনুভব করল — সে একা নয়।
ল্যাবে ফেরার পথে আদিয়ান তার পাশে হাঁটল।
দরজায় এসে রুহি থামল। ঘুরল।
"আপনার বাবা আমার পরিবারকে হুমকি দিয়েছেন।"
"জানি।"
"তাহলে?"
আদিয়ান খুব কাছে এল।
রুহির চোখে সরাসরি তাকাল।
"তোমার পরিবারের কিছু হবে না। এই কথা আমি দিচ্ছি।"
রুহি তার চোখে সত্য খুঁজল।
"আদিয়ান খানের কথা বিশ্বাস করা যায়?"
সে অদ্ভুত নরম গলায় বলল — "আমার অনেক কিছুই বিশ্বাসযোগ্য নয়। কিন্তু যখন কাউকে রক্ষা করার কথা বলি — সেটা রাখি।"
সে চলে গেল।
রুহি একা।
বাইরে শহর। ভেতরে দুটো মানুষের দুটো দহন।
একটা — ঘৃণা আর ভালোবাসার মাঝখানে।
আরেকটা — অন্ধকার আর আলোর মাঝখানে।
মেলার পথ তৈরি হচ্ছে।
ধীরে। অনিবার্যভাবে।
[ চলবে ]
🥺❤️🩹
উত্তরমুছুন