দহন শেষে প্রেম - প্রথম অধ্যায়

 

দহন শেষে প্রেম 

★৺ দহন শেষে প্রেম ৺★

 ✍️ লেখনীতে: আব্দুল্লাহ আল মিজান

______________________________________________

 কিছু গল্প লেখা হয় না —

 কিছু গল্প জমে ওঠে।

 বৃষ্টির মতো। বিষের মতো।

 ভালোবাসার মতো।

 ধীরে। নিঃশব্দে। অনিবার্যভাবে।

━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━

প্রথম অধ্যায় : মেঘের আড়ালে ধ্রুবতারা

━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━


(#পর্ব_১) — বিশ বছর আগে

সেই রাতে বৃষ্টি নামেনি।

বৃষ্টি ঝরেছিল — যেন আকাশ কান্নার ভার আর সামলাতে পারছিল না। শহরের রাস্তায় জল জমে আয়নার মতো হয়ে গিয়েছিল, আর সেই আয়নায় রাতের বাতিগুলো কাঁপছিল — যেমন কাঁপে মিথ্যার মুখোশ। টলমল করে, কিন্তু পড়ে যায় না।

গুলশানের এক বিশাল বাড়ির সব জানালায় আলো ছিল। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতো উৎসব চলছে। কিন্তু সেই আলোর ভেতরে যা ঘটছিল — তার জন্য পৃথিবীর কোনো ভাষায় উৎসবের শব্দ নেই।

ডাইনিং টেবিলে দুজন বসেছিলেন।

একজনের বয়স পঁয়তাল্লিশ। চুলে তখনো পাক ধরেনি। হাসিটা মায়াময়, কণ্ঠটা উষ্ণ — যেভাবে শিকারি হাসে ঠিক শিকারের সামনে, ঠিক সেইভাবে। এই মানুষটির নাম আফজাল খান।

অন্যজনের মুখে এক ধরনের নির্ভার আনন্দ। রহমত উল্লাহ। বয়স বিয়াল্লিশ। তার গবেষণা — তিন বছরের ঘুম না ঘুমানো রাতের ফসল — আগামীকাল প্রকাশিত হবে। সেই গবেষণায় এমন একটি জেনেটিক ফর্মুলা, যা দিয়ে ক্যানসারে মরতে বসা লক্ষ লক্ষ মানুষকে বাঁচানো সম্ভব।

কিন্তু সেই ফর্মুলা বাজারে এলে আফজাল খানের ব্যবসার সাম্রাজ্য ধুলোয় মিশে যাবে।

দুজন কফি খাচ্ছিলেন গল্প করছেন । হাসছিলেন। রহমত উল্লাহ জানতেন না — এই হাসি, এই কফি, এই আড্ডা সবকিছু আগে থেকে পরিকল্পনা করা।

রাত গভীর হলো। আফজাল খানের বাসায়ই রহমত উল্লাহ ঘুমিয়ে পড়লেন।

গভীর রাতে আফজাল খান ঘুম উঠলেন।

ধীরে। নিঃশব্দে।

তার মুখ থেকে সেই মায়াময় হাসি মুছে গেছে। চোয়ালের রেখা শক্ত। চোখে কোনো দ্বিধা নেই — শুধু একটা হিমশীতল হিসেব।

পকেট থেকে বের করলেন একটি সরু সিরিঞ্জ। নীলচে তরল ভেতরে — চোখে দেখলে পানির মতো নিরীহ, কিন্তু যার প্রতিটি অণু মানুষের স্নায়ুতন্ত্রে বছরের পর বছর ধরে ধীরে ধীরে বিষ ঢালে।

সিরিঞ্জ ফোটানোর ঠিক আগে তিনি একবার থামলেন।

মাত্র একবার।

রহমত উল্লাহর মুখের দিকে তাকালেন — সেই নির্ভার ঘুমন্ত মুখ।

তারপর ফোটালেন।

রহমত উল্লাহ ঘুমের ভেতরে একবার মাত্র ছটফট করলেন। তারপর স্থির।

আফজাল খান সিরিঞ্জ পকেটে রাখলেন। বুকশেলফের কাছে গেলেন। রহমত উল্লাহর গবেষণার পুরো নথি নিজের ব্যাগে ভরলেন।

বেরিয়ে গেলেন।

নিশ্চিন্তে।

বাইরে বৃষ্টি পড়ছিল।

কিন্তু ঘরে কোনো সাক্ষী নেই বলে তিনি ভেবেছিলেন।


তিনি জানতেন না—অন্ধকার ঘরের এক কোণে একটি লাল এলইডি লাইট মিটমিট করে জ্বলছিল। একটি লেন্সের নির্নিমেষ দৃষ্টি রেকর্ড করে নিয়েছিল সেই রাতের প্রতিটি বিশ্বাসঘাতকতা। আর সেই লেন্সের ওপাশে থাকা মানুষটি তখন কাঁপছিলেন—ভয়ে নয়, বরং এক প্রচণ্ড ঘৃণায়। 


তিনি সেই রাতেই চাইলে চিৎকার করতে পারতেন, কিন্তু জানতেন—আফজাল খানের ক্ষমতার থাবা কতদূর বিস্তৃত।  সামনে আসা মানে নিজের মৃত্যু ডেকে আনা। তাই তিনি স্থির দাঁড়িয়ে দেখলেন বন্ধুর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের দৃশ্য। 

তিনি সেই ফুটেজটি একটি এনক্রিপটেড ফোল্ডারে লুকিয়ে ফেললেন। যার নাম দিলেন কেবল একটি কোড। 


সঠিক সময়ের অপেক্ষায় তিনি মিলিয়ে গেলেন অন্ধকারের অতলে। তিনি জানতেন না সেই সময় আসতে বিশ বছর লেগে যাবে, কিন্তু তিনি জানতেন—অন্ধকার যতই গভীর হোক, আলোর একটা চাবিকাঠি তিনি নিজের হাতে রেখে যাচ্ছেন।


(#পর্ব_২) — বিশ বছর পর


শহরের আকাশে সেদিন মেঘ জমেছিল — ভারী, ধূসর, নিচু। যেন পৃথিবীটাকে চেপে ধরতে চাইছে।

একটি বিশাল ভবনের ড্রয়িংরুমে সকালের আলো এসেছে — কিন্তু সেই আলোয় উষ্ণতা নেই। বড় কাচের জানালা দিয়ে রোদ যতটুকু ঢোকে, ততটুকু ঠান্ডাই থাকে। যেন এই বাড়ির কাচ রোদকে ভেতরে আসতে দেয়, কিন্তু তার উত্তাপ আটকে দেয়।

আফজাল খান ডাইনিং টেবিলে বসে খবরের কাগজ পড়ছিলেন।


তার মুখে সেই চিরচেনা প্রশান্তি — যে প্রশান্তি দেখলে মনে হয় এই মানুষের কোনো পাপ নেই, কোনো ভয় নেই, কোনো অতীত নেই।

সেই প্রশান্তিই তার সবচেয়ে বড় মুখোশ।

তারপর সিঁড়িতে পদশব্দ শোনা গেল।


একটা বিশেষ পদশব্দ — ধীর, নিশ্চিত, এবং এমন কিছু বহন করে যা শুনলে মনে হয় পৃথিবীটা একটু সরে যায়। আফজাল খান কাগজ নামালেন না। কিন্তু তার আঙুল সামান্য শক্ত হলো।


আদিয়ান খান নামছে।

ছয় ফুট এক ইঞ্চি। কাস্টম-মেড ব্ল্যাক স্যুট — প্রতিটি সেলাই যেন তার শরীরের কথা জেনে তৈরি। কব্জি পর্যন্ত নিখুঁত ভাঁজ। বাম হাতের কব্জিতে একটি রোলেক্স — যার কাঁটা কোনোদিন পিছিয়ে পড়েনি। ঠিক তার মতোই।

তার চলার মধ্যে একটা অদ্ভুত ব্যাপার আছে — কোনো তাড়া নেই, কোনো দ্বিধা নেই, প্রতিটি পদক্ষেপ যেন আগে থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া।

সে ড্রয়িংরুমে ঢুকল।

ঘরের বাতাস বদলে গেল।


আদিয়ানের চোখ — কয়লার মতো কালো। দূর থেকে শীতল মনে হয়। কিন্তু কাছে গেলে বোঝা যায় এই শীতলতা আসলে একটা প্রচণ্ড উত্তাপের উপর বরফের আস্তরণ।


"আদিয়ান।" আফজাল খান কাগজ নামালেন। "আজ ক্যানসার ড্রাগের প্রেজেন্টেশন। চাই তুমি....

"না।

এক শব্দ। কিন্তু সেই এক শব্দে এমন একটা চূড়ান্ততা ছিল যে বাকি কথাটা আফজাল খানের গলায় আটকে গেল।

আদিয়ান টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াল। বাবার চোখে সরাসরি তাকাল।

আফজাল খান দৃষ্টি সরিয়ে নিলেন।

সবসময় সরিয়ে নেন।


"বিজ্ঞানের কথা বলা হলে থাকতাম।" আদিয়ানের কণ্ঠ শান্ত — এতটাই শান্ত যে শুনলে গায়ে কাঁটা দেয়। "কিন্তু ওই ঘরে কী হবে আমরা দুজনেই জানি। মুনাফার অঙ্ক। আর সেই অঙ্কের আড়ালে কত মানুষের মৃত্যু ঢাকা পড়বে — সেটার হিসাব কেউ রাখবে না।"

নিস্তব্ধতা।


"এই সাম্রাজ্য আপনার টাকায় দাঁড়িয়ে নেই, বাবা।" শেষ শব্দটায় কোনো উষ্ণতা নেই। "দাঁড়িয়ে আছে আমার সিদ্ধান্তে। আমি যখন না বলি — সেটাই শেষ কথা।"

সে ঘুরে হাঁটতে শুরু করল।

আফজাল খান পেছন থেকে ডাকলেন না।

ডাকার সাহস হলো না।


ড্রাইভওয়েতে একটি সিলভার রঙের গাড়ি অপেক্ষা করছিল। আদিয়ান উঠল। দরজার পাশে দাঁড়ানো সশস্ত্র গার্ডরা মাথা নিচু করল — তাদের চোখে সম্মান নেই, আছে এক বিশেষ ধরনের ভয়। সেই ভয় যা মানুষ অনুভব করে যখন বোঝে — সামনের মানুষটার সামনে কোনো যুক্তি কাজ করে না।

গাড়ি চলে গেল।

আফজাল খান একা।

তার হাতের কাগজটা মেঝেতে পড়ে গেছে।

তিনি তুলতে গেলেন না।


শুধু ভাবলেন — এই ছেলেকে আমি জন্ম দিয়েছিলাম। কিন্তু এই ছেলে কখন এত বড় হলো যে আমি নিজেই তার সামনে ছোট হয়ে যাই?


এবং তারপর এক অদ্ভুত প্রশ্ন মাথায় এলো — নাকি এটাই পাপের মূল্য?


(#পর্ব_৩) — পুরান ঢাকা


পুরান ঢাকার সেই গলিটা খুঁজে পেতে হলে তিনটা বাঁক নিতে হয়।

প্রথম বাঁকে একটা পান দোকান। বুড়ো মানুষটা প্রতিদিন ভোরে ঠিক একই সময়ে খোলে, রাত দশটায় বন্ধ করে — তার জীবনে কোনো হেরফের নেই। দ্বিতীয় বাঁকে একটা বটগাছ — তার শিকড় রাস্তার পাথর ফাটিয়ে উঠে এসেছে, যেন মাটির নিচে কিছু একটা বের হতে চাইছে কিন্তু পারছে না। তৃতীয় বাঁকে একটা পুরনো মসজিদ — দেয়ালে সবুজ শ্যাওলা, কিন্তু সকালের আজানে এই পুরো গলি যেন একটু সোজা হয়ে দাঁড়ায়।


তারপর — সেই বাড়ি।


দেখলে প্রথমে মনে হয় পরিত্যক্ত। লোহার গেটে মরচে। দেয়ালের রং উঠে গেছে। উঠোনে একটা বেলিফুলের গাছ — কেউ তার যত্ন নেয় না, তবু সে ফুল ফোটায়। যেন বলছে — যত্ন না পেলেও বেঁচে থাকা যায়।


কিন্তু ভেতরে ঢুকলে সব বদলে যায়।


বইয়ের গন্ধ। পুরনো কাঠের গন্ধ। আর একটা অদ্ভুত গন্ধ যা ঠিক চেনা যায় না — কিন্তু যা শুঁকলে মনে হয় এই বাড়িতে একসময় অনেক স্বপ্ন ছিল।

সেই স্বপ্নের অবশেষ এখনো আছে।

একটি মেয়ের মধ্যে।


সে সেদিন সকালে তার সাদা ল্যাব কোট গায়ে দিচ্ছিল — যত্ন করে, ভাঁজ ঠিক করে। টেবিলে সাজানো অত্যাধুনিক বায়ো-সেন্সর। পাশে একটি ছোট কাঁচের বাক্স — তার ভেতরে দুটো অপটিক্যাল চিপ।


এই চিপ দুটো দেখতে সাধারণ। কিন্তু এর ভেতরে আছে তিন বছরের ঘুম বেচে দেওয়া পরিশ্রম। একটি জেনেটিক কোড — যা মানুষের মৃত স্নায়ুকোষকে আবার জীবন দিতে পারে।

এবং সবচেয়ে বেশি আছে — একটি মেয়ের বাবাকে বাঁচানোর শেষ চেষ্টা।


মেয়েটির নাম নুসরাত জাহান রুহি।

রুহিকে দেখতে প্রথমে চোখ পড়ে না — সে সেই ধরনের সুন্দর যা দ্বিতীয়বার তাকালে বোঝা যায়। মেঘবরণ কালো চুল কপালে এসে পড়েছে — অবাধ্য হয়ে, যেন জানে ঠিক কোথায় থাকলে ভালো দেখায়। টানা চোখে এক স্বচ্ছতা আছে যা সরাসরি হৃদয়ে গিয়ে পৌঁছায়। চিবুকের কাছে একটি ছোট্ট কালো তিল — যেন শিল্পী শেষ তুলির টানে বলেছে, এখানেই সম্পূর্ণ।

কিন্তু রুহির সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য তার মুখে নয়।

তার চোখে যে জেদ আছে — সেটায়।


 জানালার ধারে বাবা,রহমত উল্লাহ সাহেব ইজিচেয়ারে বসে আছেন। বাইরে তাকিয়ে। কিন্তু তার দৃষ্টি কোথাও পৌঁছায় না — যেন চোখ দুটো আছে, কিন্তু যা দেখার ছিল তা অনেক আগেই হারিয়ে গেছে।


হঠাৎ একটা কাশি।

রুহির হাত ল্যাপটপের উপর থেমে গেল।

সে উঠে গেল। বাবার কপালে হাত রাখল।

তার আঙুলগুলো সামান্য শক্ত হলো।

বরফ।

"কিছু হয়নি রে মা।" রহমত উল্লাহ সাহেব ঘুরলেন। মুখে সেই ম্লান হাসি — যে হাসি দেখলে বুকে ব্যথা করে।

রুহি কিছু বলল না। শুধু বাবার হাতটা দুই হাতে ধরে রাখল।

সেই ঠান্ডা হাত।

রান্নাঘর থেকে আয়েশা বেগম বেরিয়ে এলেন। তাঁর চোখ দুটো মেয়ের দিকে গেল — সেই চোখে বিশ বছরের একটা প্রশ্ন জমা আছে। প্রশ্নটা কখনো মুখে আসে না। কিন্তু থাকে।


"তোর বাবা সব লুকাতে চায়। কিন্তু আমি দেখি। প্রতি রাতে দেখি।"

তুলি পেছন থেকে এল। রুহির কাঁধে মাথা রাখল — যেভাবে ছোটরা রাখে বড়দের কাঁধে, বিশ্বাস নিয়ে।


"আপু, আজকেও কাজল দেবে না?"


রুহি ছোট বোনের মাথায় একটু হাত রাখল।

"পরে।"


সে মায়ের দিকে একবার তাকাল। সেই তাকানোয় কোনো কথা নেই — শুধু একটা প্রতিশ্রুতি।

তারপর ল্যাব কোট ঠিক করে বেরিয়ে গেল।


---


(#পর্ব_৪) — লাইব্রেরি


বিকেলের আলো হেলে পড়েছে।


একটি বড় লাইব্রেরির তিনতলার শেষ কোণের টেবিল — রুহির নিজের। সেখানে কেউ আসে না। মনোযোগ ভাঙে না।

রুহি কোড টাইপ করছিল। তার চারপাশে বইয়ের গন্ধ। জানালা দিয়ে শেষ বিকেলের সোনালি আলো এসে তার চুলে পড়েছে। টেবিলে সেই কাঁচের বাক্স।

সে জানত, বাইরে কেউ আছে।

পাত্তা দেয়নি।

তারপর লাইব্রেরির দরজা খুলল।

এবং এমন কিছু একটা ঢুকল যা দরজা দিয়ে ঢোকার আগেই অনুভব করা যায়।


রুহি মাথা তুলল না। কিন্তু তার আঙুলগুলো কিবোর্ডের উপর এক মুহূর্তের জন্য থামল।

ঘরের বাতাস বদলে গেছে।

সে আবার কোড টাইপ করতে শুরু করল।

পদশব্দ। বইয়ের সারির মাঝে। ধীর, নিশ্চিত।

দরজার কাছে দুজন মানুষ দাঁড়িয়ে ছিল। তারা হঠাৎ পিছিয়ে গেল। কোনো কথা নেই, কোনো আওয়াজ নেই — শুধু পিছিয়ে গেল।

পদশব্দ এগিয়ে আসছে।

তিনতলায় উঠল।

শেষ কোণের টেবিলে এসে থামল।


রুহি স্ক্রিনে চোখ রেখেই টের পেল — কেউ একজন তাকে দেখছে।

সে মাথা তুলল।

একজন মানুষ।

লম্বা। কালো পোশাক। তার চোখ — কয়লার মতো কালো, কিন্তু সেই কালোর ভেতরে কিছু একটা জ্বলছে যা রুহি ঠিক চিনতে পারল না।

সে আবার স্ক্রিনে চোখ রাখল।

মানুষটা এগিয়ে গেল।


টেবিলের পাশ দিয়ে যেতে গেল।

তার পোশাকের হাতা লাগল সেই কাঁচের বাক্সে।

বাক্সটা মেঝেতে পড়ল।

একটা ক্ষুদ্র শব্দ।

কিন্তু সেই শব্দে যেন একটা পুরো জীবন ভেঙে পড়ল।

রুহি স্ক্রিন থেকে চোখ তুলল।


মেঝেতে ছড়িয়ে আছে ভাঙা কাঁচ।

এবং তার মধ্যে — চুরমার হয়ে যাওয়া দুটো চিপ।

তিন বছর।

রুহি নড়তে পারছিল না।

সে কতক্ষণ বসে রইল জানে না।

তারপর ধীরে ধীরে ল্যাপটপ বন্ধ করল। ব্যাগে ভরল।

শক্ত হাতে।

মাথা তুলল।


মানুষটা তখন মেঝের দিকে তাকিয়েছিল।

তারপর রুহির দিকে তাকাল।

এবং রুহির মুখ দেখে তার পদক্ষেপ থামল।

রুহির চোখে কান্না নেই। আছে আগুন। এবং সেই আগুনের মাঝখানে একটা মহাকাশের মতো গভীর যন্ত্রণা।

তার চিবুকের তিলটা ছুঁয়ে একটা জলের ফোঁটা গড়িয়ে পড়ল।

মানুষটার বুকের বাম পাশে — ঠিক বুকের কোথাও — একটা অদ্ভুত সংকোচন হলো। যেন কিছু একটা মুষ্টি পাকিয়ে ধরল।

সে সেই অনুভূতি চেনে না।

রুহি ঠোঁট খুলল।


"আপনি কি জানেন আপনি কী ভেঙেছেন?"

তার কণ্ঠ কাঁপছে — কিন্তু সেই কাঁপন ভয়ের নয়। এটা এমন কারো কণ্ঠ যে নিজেকে ধরে রাখছে প্রচণ্ড শক্তি দিয়ে।


"এই চিপে আমার তিন বছর ছিল। আমার বাবার জীবন ছিল। আপনি একটা বাক্স ভাঙেননি — আপনি একটা মানুষের শেষ আশা ভেঙেছেন।"

মানুষটা পকেট থেকে একটি কার্ড বের করল।


"আপনার হারানো সত্তর শতাংশ আছে। বাকি ত্রিশ পুনরুদ্ধার সম্ভব। এই ঠিকানায় আসুন।"

রুহি কার্ড নিল। পড়ল।

খান বায়োটেক।

তার দৃষ্টি উঠে এল। কার্ড থেকে মানুষটার মুখে।

"আফজাল খানের ছেলে আমাকে সাহায্য করতে এসেছেন?"


মানুষটা সামান্য চমকাল। মাত্র সামান্য — চোখের পাতা একটু নামল, আবার উঠল।


"আপনি এই নাম চেনেন।"

"চিনব না কেন।" রুহির কণ্ঠ নিচু হলো। প্রতিটি শব্দ যেন ধারালো। "আমার বাবার জীবন যে মানুষটা চুরি করেছে — তার নাম আমি চিনব না?"

নিস্তব্ধতা।

লাইব্রেরির শীতল বাতাসে সেই কথাগুলো ভেসে রইল।

মানুষটা কার্ডটা টেবিলে রেখে দিল।

"আপনার বাবাকে বাঁচাতে হলে এই ঠিকানায় আসতে হবে। সিদ্ধান্ত আপনার।"

সে ঘুরল।

হাঁটতে শুরু করল।

একবারের জন্যও পেছনে তাকাল না।


কারণ সে জানত — তাকালে নিজেকে ধরে রাখা কঠিন হতো।

রুহি সেই শূন্য দরজার দিকে তাকিয়ে রইল।

হাতে কার্ড।

বুকে এক প্রলয়। সে জানত না, এই কার্ডটি কেবল একটি ঠিকানা নয়—এটি বিশ বছর আগে রোপণ করা সেই বিষবৃক্ষের গোড়ায় কুঠার মারার প্রথম আমন্ত্রণ।


[ চলবে ]

মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

দহন শেষে প্রেম

দহন শেষে প্রেম - তৃতীয় অধ্যায়