দহন শেষে প্রেম, দ্বিতীয় অধ্যায়

━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━
দ্বিতীয় অধ্যায় : দহনের নীল নকশা
লেখনীতে:আব্দুল্লাহ আল মিজান
━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━

যে মানুষ তোমাকে বাঁচায় —
সে তোমাকে বন্দিও করতে পারে।
এবং সবচেয়ে ভয়ংকর সত্য হলো —
দুটো কাজ সে একই মুহূর্তে করতে পারে।
আর তুমি বুঝতেও পারবে না
কোনটা সত্যি।

(#পর্ব_৫) —

বাইরে ঢাকা শহর তার চিরচেনা কোলাহলে মেতে আছে।

রিকশার ঘণ্টা। হকারের ডাক। বৃষ্টির আগের সেই ভেজা গন্ধ যা মাটি থেকে উঠে আসে — যেন পৃথিবী বলছে, কিছু একটা আসছে।

কিন্তু গাড়ির ভেতরে — কোনো শব্দ নেই।

আদিয়ান স্টিয়ারিং ধরে বসে আছে। ইঞ্জিন চালু করেনি।

তার সামনের কাচে শহরের আলো পড়ে একটা প্রতিচ্ছবি তৈরি হয়েছে — ঝাপসা, কাঁপা। আর সেই প্রতিচ্ছবিতে বারবার ভেসে উঠছে একটাই মুখ।
মায়াবী। কান্নাভেজা। অদম্য।
তার ডান হাত স্টিয়ারিং ছেড়ে নিজের বুকের বাম পাশে গেল।
সেখানে কিছু একটা হচ্ছে।
আদিয়ান নিজেও বুঝতে পারছে না।
সে রিয়ার-ভিউ মিররে নিজের চোখের দিকে তাকাল।

সেই কয়লার মতো কালো চোখ — আজ সেই চোখে একটা অচেনা অস্থিরতা।
সে দ্রুত চোখ সরিয়ে নিল।
তার মৃত মায়ের কথা মনে পড়ল।

মা বলতেন — "আদিয়ান, ক্ষমতা দিয়ে পৃথিবী জেতা যায়। কিন্তু কারো হৃদয়ে জায়গা পেতে হলে নিজের হৃদয়টা আগে খুলতে হয়।"
আদিয়ান তখন হাসত। "মা, হৃদয় খুললে দুর্বলতা ঢোকে।"
মা বলতেন — "না বাবা। হৃদয় খুললে মানুষ ঢোকে।"

সে ইঞ্জিন চালু করল।
শহরের আলোর মাঝে মিলিয়ে যেতে যেতে মনে মনে বলল —
পাথুরে এই হৃদয়ে তুই নামালি প্রথম দহন,
তোকে ধ্বংস করার শপথ আজ হলো তোরই রক্ষণ।

(#পর্ব_৬) — অন্ধকার প্রকোষ্ঠ

সেই বিশাল ভবনের মাটির নিচে একটা ঘর আছে।
লিফটে একটাই বোতাম — কোনো সংখ্যা নেই, শুধু একটা চিহ্ন। সেই চিহ্ন অন্য কেউ বোঝে না।

চেম্বারের দরজা খুলল।

ভেতরে কোনো জানালা নেই। বাইরের পৃথিবীর আলো এখানে নিষিদ্ধ। চারদিকে বিশাল মনিটরের সারি — যেন এক প্রযুক্তির কারাগার।

আদিয়ান চেয়ারে বসল।
একটি স্ক্রিনে — পুরান ঢাকার সেই জীর্ণ বাড়ির একটি ঘর। রহমত উল্লাহ সাহেব বিছানায়। তার বুক ওঠানামা করছে — ধীরে, অনিশ্চিতভাবে। পাশে মেঝেতে রুহি। তার হাত বাবার হাত জড়িয়ে ধরে আছে। তার কাঁধ কাঁপছে।
নিঃশব্দে।

পাশের ঘরে আয়েশা বেগম জায়নামাজে বসে। তার ঠোঁট নড়ছে।
কোণে তুলি — রুহির ল্যাব কোটটা বুকের কাছে জড়িয়ে। শূন্য দৃষ্টিতে দেয়ালের দিকে।

আদিয়ানের ডান হাত টেবিলের উপর মুষ্টিবদ্ধ হলো।
তারপর ছেড়ে দিল।
তারপর আবার মুষ্টিবদ্ধ।

সে অন্য মনিটরে চোখ দিল — আন্তর্জাতিক ডেটা স্ট্রিম। বিভিন্ন দেশের গোপন নথি। চুক্তির কাগজ। এই তথ্যগুলো পৃথিবীর কোনো সরকারি সংস্থার কাছে নেই — শুধু এই ঘরে আছে।

কিন্তু আদিয়ানের চোখ বারবার সেই প্রথম স্ক্রিনে ফিরে যাচ্ছে।
সেখানে রুহি।
সেখানে সেই কাঁপা কাঁধ।
সে জানে রুহি আসবে।
কারণ আর কোনো পথ নেই।

(#পর্ব_৭) — পিতা-পুত্রের যুদ্ধ

পরদিন ভোরে।
চেম্বারের ভারী দরজা ঠেলে প্রবেশ করলেন আফজাল খান।

তার জুতার শব্দ সেই পাথরের মেঝেতে একটা বিশেষ ধরনের শব্দ করে — দম্ভের শব্দ।

আদিয়ান মনিটর থেকে চোখ না সরিয়েই বলল, "কী চান?"
"চিপটা নষ্ট করলে কেন?"
কোন চিপ?"

আফজাল খান হাসলেন। সেই হাসিতে বাঁকা ভাব। "ভান করতে হবে না। লাইব্রেরিতে গিয়েছিলে।"

আদিয়ান চেয়ার ঘুরিয়ে বাবার মুখোমুখি হলো।
দুটো দৃষ্টি মিলল।

একটায় বয়সের ধূর্ততা।
অন্যটায় এমন কিছু — যার সামনে ধূর্ততা কাজ করে না।
আফজাল খান চোখ সরিয়ে নিলেন।

"আপনার পাঠানো লোকগুলো ঠিকমতো কাজ করতে পারেনি।
বাহিরে আমাদের শত্রুদের অনেকই ছিলো।

আদিয়ান বলল — কণ্ঠে কোনো রাগ নেই, শুধু এক হিমশীতল তথ্য। "পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাচ্ছিল। চিপটা ভেঙে প্রমাণ মুছে না দিলে আমাদের নাম জড়াত।"

"রুহির ফর্মুলা আমাদের দরকার।"

"জানি। সেই ফর্মুলার বিষয়টা এখন আমার। রুহি আমার ল্যাবে কাজ করবে। তার বাবার চিকিৎসা আমি করাব। এই বিষয়ে অন্য কেউ থাকবে না।"
"এই বিষয়ে আর কোনো কথা নয়।
"
আফজাল খান ঘুরলেন। দরজার কাছে গিয়ে থামলেন।

পেছন ফিরে না তাকিয়ে বললেন,
তুমি কি এত দুর্বল যে শত্রুদের ভয় পাবে?
মেয়েদের মায়ায় পরো না আদিয়ান,
তুমি আমাদের ইতিহাস ঐতিহ্যের কথা ভুলে যাবে না?

আদিয়ান জবাব দিল না।
আফজাল খান চলে গেলেন।
আদিয়ান স্ক্রিনের দিকে ফিরল।
রুহি কার্ডটা হাতে নিয়েছে।
তার চোয়াল শক্ত।
সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

আদিয়ানের ডান হাতের আঙুলগুলো টেবিলের উপর সামান্য শিথিল হলো।

---

(#পর্ব_৮) — রুহির রাত

পুরান ঢাকার সেই বাড়িতে রাতটা নেমেছিল ধীরে।

বাইরে রাস্তার শব্দ থেমে গেছে। শুধু মাঝে মাঝে দূর থেকে একটা ট্রেনের শব্দ — যেন পৃথিবী কোথাও যাচ্ছে, কিন্তু এই বাড়িটা যেতে পারছে না।

রহমত উল্লাহ সাহেবের ঘর থেকে ডাক্তার বেরিয়ে এলেন।

রুহি করিডোরে দাঁড়িয়ে ছিল।

ডাক্তার তার মুখের দিকে তাকালেন — সেই মুখে যা আছে তা দেখে তিনি একটু থামলেন।

নিচু স্বরে বললেন, "মা, এই বিষ অত্যন্ত বিরল। নিউরোটক্সিন যা ধীরে ধীরে স্নায়ু ক্ষয় করে। এর প্রতিষেধক তৈরি করতে পারে এমন সুবিধা দেশে মাত্র একটি জায়গায় আছে।"

রুহির বুকের ভেতর কিছু একটা জমে গেল।
"কোথায়?"

ডাক্তার একটু ইতস্তত করলেন।
"খান পরিবারের ল্যাবরেটরিতে।"
রুহির দুই হাত মুষ্টিবদ্ধ হলো।
ধীরে খুলল।

যে মানুষটা তার বাবাকে বিষ দিয়েছে বলে সে জানলো — তার কাছেই আছে সেই বিষের ঔষধ।

মা রুহির হাত ধরলেন। সেই হাত কাঁপছিল।

"রুহি, তুই ওদের ল্যাবরেটরিতে যাসনে। ওই পিশাচদের ডেরায় যাসনে। দরকার হলে আমি মানুষের দ্বারে দ্বারে ভিক্ষে করব।"

রুহি মায়ের মুখের দিকে তাকাল।
এই মুখে বিশ বছরের ক্লান্তি জমা। এই চোখে বিশ বছরের ভয়।
"মা।"
"না।"
"মা, বাবার সময় নেই।"

আয়েশা বেগম কাঁদলেন। নিঃশব্দে। শুধু তার কাঁধ কাঁপছে।

তুলি এসে রুহির হাত ধরল। ছোট বোনের হাত — সেই হাতে ভয় আছে, কিন্তু বিশ্বাসও আছে।

রুহি পকেট থেকে কার্ডটা বের করল।

তাকিয়ে রইল।

মনে মনে বলল —

আপনার জালে ধরা দিচ্ছি না। আসছি কারণ অন্য পথ নেই। কিন্তু ভেতরে ঢুকে যা খুঁজব — তা নিয়েই বেরিয়ে আসব।
বাইরে বৃষ্টি নামল।
ঠিক বিশ বছর আগের মতো।
বাবার ঘর থেকে একটা মৃদু কাশির শব্দ।
রুহির চোয়াল শক্ত হলো।

---

(#পর্ব_৯) — চুক্তি

সেই বিশাল ভবনের সর্বোচ্চ তলা।
কাচের দেয়াল ঘেরা বিশাল অফিস। নিচে শহর — ক্ষুদ্র, তুচ্ছ। মানুষগুলোকে পিঁপড়ার মতো দেখায়।

আদিয়ান জানালার সামনে দাঁড়িয়েছিল।

ইন্টারকম বলল, "স্যার, নুসরাত জাহান রুহি আসছেন।

আদিয়ানের দুই হাত পিঠের পেছনে। বাম হাত ডান হাতের কব্জি ধরে আছে — সামান্য শক্ত।

"পাঠাও।"
রুহি দরজা খুলে ঢুকল।

আদিয়ান পেছনে না ঘুরেই বুঝল — কারণ ঘরের বাতাস বদলে গেল। একটা শান্ত কিন্তু তীব্র উপস্থিতি।

সে ধীরে ঘুরল।
রুহি দরজার কাছে। সাদা সালোয়ার কামিজ। চোখ দুটো লাল — সেই লাল কান্নার নয়, জেদের।
দুটো দৃষ্টি মিলল।

আদিয়ান নিজের চেয়ারে ফিরে গেল। বসল।

"শেষ পর্যন্ত বাস্তবতাই অহংকারকে হার মানাল।"

রুহি এগিয়ে এল। টেবিলের সামনে দাঁড়াল। তার পিঠ সোজা।

"আমি হারিনি।" প্রতিটি শব্দ ধারালো। "এসেছি চুক্তি করতে। আমার বাবার চিকিৎসার বিনিময়ে আপনার ল্যাবে কাজ করব। আপনাদের খান পরিবার এই ঋণের দায়বদ্ধ।"

আদিয়ান তার দিকে তাকিয়ে রইল।
চিবুকের সেই তিলটা। চোখের আগুন।

সে উঠে দাঁড়াল। টেবিল পেরিয়ে এল না — কিন্তু তার উপস্থিতি এতটাই তীব্র যে ঘরের বাতাস ভারী হলো।
"তুমি মনে করছ চুক্তি করতে এসেছ।"

"হ্যাঁ।"

"ভুল।" তার গলা নিচু। "তুমি এখানে এসেছ কারণ আমি চেয়েছিলাম। যে জালে পা দিয়েছ — সেটা তোমাকে ধরার জন্য নয়। বাঁচানোর জন্য।"

রুহি পিছিয়ে গেল না।

"উপকারী সাজছেন। কিন্তু আমি জানি এই পৃথিবীতে কেউ বিনামূল্যে কিছু করে না।"

আদিয়ানের চোখে একটা ঝলক — যা সে দ্রুত লুকাল।
এই মেয়ে ভয় পায় না। এই মেয়ে আন্দাজ করতে পারে।

"তোমার বাবার চিকিৎসা কাল থেকে। তোমার জন্য আলাদা ল্যাব তৈরি হবে। হারানো গবেষণা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা হবে। কিন্তু একটাই শর্ত।"

"কী শর্ত।"
"তুমি আমার বলয়ের বাইরে যাবে না।"
রুহির চোখে আগুন জ্বলে উঠল।
"এটা বন্দিত্ব।"
"হয়তো। কিন্তু এই বন্দিত্বে বেঁচে থাকবে।"

দুজন তাকিয়ে রইল।
রুহি মাথা নামাল না।
"ঠিক আছে। কিন্তু মনে রাখবেন — আমার কাজ শেষ হলে চলে যাব।"

আদিয়ান কিছু বলল না।

মনে মনে বলল — চলে যাবে? দেখা যাবে।

[ চলবে ]

মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

দহন শেষে প্রেম - প্রথম অধ্যায়

দহন শেষে প্রেম

দহন শেষে প্রেম - তৃতীয় অধ্যায়