দহন শেষে প্রেম - চতুর্থ অধ্যায়
━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━
চতুর্থ অধ্যায় : বিশ্বাসের ব্যবচ্ছেদ।
✍️ লেখনীতে: আব্দুল্লাহ আল মিজান
━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━
বিশ্বাস হলো সেই কাঁচের দেয়াল ৺
যার ওপার থেকে সবকিছু স্পষ্ট দেখা যায়,
কিন্তু একবার ফাটল ধরলে —
সবকিছুই হয়ে যায় ঝাপসা এবং ধারালো।
আর সবচেয়ে ভয়ংকর সত্য হলো —
ফাটলটা কখনো বাইরে থেকে আসে না।
আসে ঠিক ভেতর থেকে।
(#পর্ব_১৮) — একটি আরজি
ল্যাবরেটরির কৃত্রিম আলো বিকেলেও রাতের মতো একরকম থাকে।
সকালের মতো ঠান্ডা, রাতের মতো নির্জন। বাইরে পৃথিবী কতটুকু আলোকিত বা অন্ধকার — এই ঘরের দেয়াল সেটা জানতে দেয় না। যেন এই ল্যাব একটা আলাদা মহাবিশ্ব — যেখানে সময় কেবল কাজের ভেতরে বয়, অনুভূতির ভেতরে নয়।
রুহি স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু স্ক্রিনে কী লেখা তা সে দেখছে না।
সে দেখছে বাবার মুখ। ইজিচেয়ারে বসা সেই ম্লান হাসি। মায়ের জায়নামাজে নত মাথা। তুলির সেই শূন্য দৃষ্টি।
কতদিন হলো?
সে গণনা করতে গিয়ে থামল। গণনা করলে আরও কষ্ট হয়।
দরজার যান্ত্রিক শব্দ।
রুহি চেয়ার ঘুরিয়ে দাঁড়াল — এবং থামল। তার চোখে একটা অদ্ভুত ভাব। সেই ভাব সাধারণত থাকে না। জেদ নেই, আগুন নেই — আছে এমন কিছু যা অনেক শক্তিশালী মানুষও মাঝে মাঝে লুকিয়ে রাখতে পারে না।
আর্তি।
আদিয়ান ঢুকে ফাইল রাখতে গেল টেবিলে।
খান সাহেব।
সে থামল। রুহির কণ্ঠ আজ অন্যরকম। সেই ধারালো ভাব নেই।
রুহি একটু এগিয়ে এল।
আমি অনেকদিন ধরে এই চার দেয়ালের ভেতরে আছি। বাবা কেমন আছেন, মা ঠিকঠাক ঘুমাচ্ছেন কি না, তুলি কীভাবে দিন পার করছে — এইটুকু নিজের চোখে দেখতে চাই।" একটু থামল। "আজ কি একবার বাসায় যেতে পারব? কাল সকালের আগেই ফিরে আসব। আপনার কথার বাইরে একটাও পা ফেলব না।"
তারপর আস্তে যোগ করল — "প্লিজ।"
এই একটা শব্দ।
রুহির মুখে এই শব্দটা আগে কেউ শোনেনি। সে অনুরোধ করে না, দাবি করে। সে মাথা নোয়ায় না, সোজা থাকে।
আজ সে বলল — প্লিজ।
আদিয়ান তার মুখের দিকে তাকাল।
তার চোয়াল শক্ত হলো।
"বাইরে তোমার জন্য নিরাপদ নয়, রুহি।" তার কণ্ঠ শান্ত, কিন্তু ভেতরে কোনো একটা হিসেব চলছে। "এটা তুমি জানো।"
"আমি জানি।" রুহির চোখ নামল না। "কিন্তু আমার নিরাপত্তার নামে আমার পরিবার থেকে আমাকে বিচ্ছিন্ন রাখা — সেটাও কি এক ধরনের বন্দিত্ব নয়?"
নিস্তব্ধতা।
আদিয়ান সেই চোখে কিছু একটা খুঁজল — সন্দেহ, কৌশল, অভিনয়? কিছুই পেল না। শুধু পেল একটা মানুষের সত্যিকারের ক্লান্তি। যে ক্লান্তি মিথ্যা হয় না।
দীর্ঘশ্বাস।
"ঠিক আছে।" তার গলা নিচু। "আমি নিজে পৌঁছে দেব। এবং কাল সকালে নিজে নিয়ে আসব। এই মাঝের সময়টায় আমার বিশ্বাসের অমর্যাদা যেন না হয়।"
রুহি কিছু বলতে গেল।
আদিয়ান আগেই ঘুরে গেল।
কিন্তু দরজার কাছে গিয়ে এক মুহূর্ত থামল — রুহি দেখল না — তার হাতের আঙুলগুলো দরজার ফ্রেমে একবার চেপে বসল। তারপর ছেড়ে দিল।
বেরিয়ে গেল।
ল্যাবের কৃত্রিম আলো একই রকম জ্বলতে থাকল। কিন্তু রুহির বুকে — সেখানে কিছু একটা উষ্ণ হলো। তারপরই ঠান্ডা।
সে নিজেকে মনে করিয়ে দিল —
এটা সুযোগ। এর বেশি কিছু নয়।*
---
(#পর্ব_১৯) — যাত্রাপথ ও সতর্কবার্তা।
ঢাকার সন্ধ্যা তার চিরচেনা কোলাহলে নেমে এসেছে।
রিকশার ঘণ্টা। হকারের ডাক। দোকানের আলো রাস্তার জলে মিশে এক অদ্ভুত রঙ তৈরি করেছে — যেন শহর নিজেই কোনো অস্পষ্ট স্বপ্নের ভেতর বাস করছে।
গাড়ির ভেতরটা সেই শহর থেকে আলাদা। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত, নিঃশব্দ। রুহি জানালার দিকে তাকিয়ে আছে। আদিয়ান স্টিয়ারিং ধরে।
দুজনের মাঝখানে একটা দূরত্ব — কিন্তু সেই দূরত্বে এমন একটা টান, যা দূরত্বকে অর্থহীন করে দেয়।
আদিয়ান বলল না বলা কথাটা।
"রুহি।"
সে জানালা থেকে চোখ না সরিয়েই বলল, "বলুন।"
"আমার পরিবারের বিরুদ্ধে একা কিছু করার চেষ্টা করো না।"
রুহি এবার তাকাল।
আদিয়ানের চোখ রাস্তায়। কিন্তু তার কণ্ঠে এমন একটা ভার আছে যা সাবধানবাণী পার হয়ে অনুরোধের কাছাকাছি চলে গেছে।
"আমার বাবা যতটা ভয়ংকর হতে পারেন — তুমি তা কল্পনাও করতে পারবে না। আমি তোমাকে বিশ্বাস করে আজ নিয়ে যাচ্ছি। এই বিশ্বাসটুকু বজায় রেখো।"
রুহির ঠোঁটে একটা বাঁকা হাসি এলো — কিন্তু চোখে এলো না।
"বিশ্বাস।" সে শব্দটা আস্তে উচ্চারণ করল। "আপনার নজরদারির ক্যামেরা কি বিশ্বাস করে? নাকি আমার ঘরের কোণে বসানো সেই লেন্সও বিশ্বাসের অংশ?"
আদিয়ানের হাত স্টিয়ারিংয়ে একটু বেশি শক্ত হলো।
জবাব দিল না।
কিন্তু তার চোয়ালে যে রেখা ফুটে উঠল — সেটা রাগের নয়। সেটা এমন কারো মুখের রেখা, যে জানে সে দোষী, এবং সেই দোষ স্বীকার করার পথটা তার কাছে নেই।
রুহি আবার জানালার দিকে ফিরল।
শহরের আলো তার চোখে পড়ল — ঝাপসা, দ্রুত বদলানো।
মনে মনে বলল —
আপনি আমাকে বিশ্বাসের কথা বলছেন। কিন্তু আমার বাবাকে যে বিষ দিয়েছিল — তার সাক্ষী আমি। সেই প্রমাণ এখন আমার কাছে। এই যাত্রায় কে কাকে বিশ্বাস করছে — সেই হিসাব এখনো মেলেনি।*
---
(#পর্ব_২০) — ঘরের কোণে অচেনা ছায়া।
পুরান ঢাকার সেই বাড়িতে পা রাখতেই রুহির বুকের ভেতর কোথাও একটা গিঁট খুলে গেল।
বেলিফুলের গন্ধ। পুরনো কাঠের গন্ধ। এবং সেই অস্পষ্ট গন্ধ — যা ঠিক চেনা যায় না, কিন্তু যা শুঁকলে মনে হয়, তুমি বাড়ি এসেছ।
মা দরজায় দাঁড়িয়েই কাঁদলেন।
রুহি মাকে জড়িয়ে ধরল — শক্ত করে। সেই শক্তে অনেক কথা ছিল যা মুখে বলা যায় না।
তুলি পেছন থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। "আপু।" একটাই শব্দ। কিন্তু সেই শব্দে একটা পুরো অভিমান।
রহমত উল্লাহ সাহেব বিছানায়। রুহি বাবার ঘরে গেল। বাবার হাত ধরল।
সেই হাত আগের চেয়ে হালকা মনে হলো।
কিন্তু বাবার চোখে একটা আলো এলো — যে আলো ওষুধে আসে না।
"মা এসেছিস।"
"এসেছি, বাবা।"
খাবার টেবিলে সেদিন রাতে সবাই একসাথে। রুহি সেই টেবিলে ইচ্ছে করেই কথা বলল আদিয়ানের বিষয়ে — ল্যাবের সুযোগ-সুবিধা, বাবার চিকিৎসার ব্যবস্থা, আদিয়ানের দেওয়া প্রতিশ্রুতি।
মা শুনলেন। তুলি শুনল।
কিন্তু একজন চুপ রইল।
মাশরাফি।
পাঁচ দিন আগে বিদেশ থেকে ফেরা রুহির খালাতো ভাই। বাড়ির বড় ছেলের মতো — মাথায় সংসারের ভার, চোখে সন্দেহের আলো।
সে থালা ঠেলে উঠে দাঁড়াল।
"রুহি, তুই কাদের কথা বলছিস বুঝছিস?"
রুহি হাসল।
"বুঝছি, ভাইয়া।"
"যে পরিবার তোর বাবাকে ধ্বংস করেছে —"
"ভুলটা আফজাল খানের। আদিয়ানের নয়।" রুহির কণ্ঠ শান্ত। "আর আমি কাউকে ক্ষমা করছি না। শুধু বাবাকে বাঁচাতে চাইছি। আফজাল খানের শাস্তি হবে — সেটাও হবে। কিন্তু এই মুহূর্তে আদিয়ান আমার পাশে আছেন। এটুকু আমি জানি।"
মাশরাফি আর বলল না।
কিন্তু তার চোখের কোণে সেই সন্দেহ — যা কথায় থামে, কিন্তু মেলায় না।
টেবিলে তুলি একটু হাসল। মা রুহির হাতে হাত রাখলেন।
কিন্তু রুহি টের পেল — মাশরাফির চোখে যা আছে, তা শুধু সন্দেহ নয়। তার চেয়ে কিছু গভীর।
যেন সে কিছু জানে।
যা রুহি এখনো জানে না।
(#পর্ব_২১) — স্তব্ধ স্ক্রিন ও আর্তনাদ।
রাত গভীর হলো।
আদিয়ান তার প্রকোষ্ঠে বসে।
মনিটরের আলোয় তার মুখ নীলচে। সে কাজ করছে না। শুধু সেই একটা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছে — যেখানে পুরান ঢাকার সেই বাড়ির একটি ঘর।
রুহির ঘর।
জানালায় হালকা আলো। সে টেবিলে বসে কিছু লিখছে। ডায়েরি।
আদিয়ান এক মুহূর্তের জন্য মনে মনে ভাবল — কী লিখছে?
তারপর নিজেই ঝেড়ে ফেলল সেই ভাবনা।
তার কাজ তাকে পাহারা দেওয়া। জানার অধিকার তার নেই।
তারপর — মনিটর ঝিলিক দিল।
একবার।
দুবার।
তারপর সম্পূর্ণ কালো।
আদিয়ান সোজা হলো।
এই সিস্টেম কখনো বন্ধ হয় না। এই প্রকোষ্ঠের সংযোগ তিনটি আলাদা সার্ভারে — একটি ব্যর্থ হলে দুটো সক্রিয় থাকে। তিনটি একসাথে বন্ধ হওয়ার একটাই মানে।
কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে বন্ধ করেছে।
ভেতর থেকে।
আদিয়ান রিবুট করার চেষ্টা করল। সার্ভার সাড়া দিল না। তারপর স্ক্রিনে একটা লাইন ফুটে উঠল —
DATA DELETION IN PROGRESS. 00:47 REMAINING.
আদিয়ানের সারা শরীরে একটা শীত নামল।
কেউ শুধু সংযোগ বন্ধ করেনি — কেউ তার পুরো ডেটাবেস মুছে দিচ্ছে।
সেই ডেটাবেসে — রুহির গবেষণার অংশ আছে। রহমত উল্লাহর পুরনো ফর্মুলার টুকরো আছে। এবং আরও কিছু আছে — যা এই পৃথিবীতে মাত্র দুজন জানে।
আদিয়ান চেয়ার ছেড়ে উঠল।
গাড়ির চাবি।
দরজা।
শহরের রাত তাকে গ্রাস করল।
---
পুরান ঢাকার গলিতে তার গাড়ি যখন থামল, বাড়ির বাইরে থেকেই একটা শব্দ ভেসে এলো।
কান্নার শব্দ।
আদিয়ান দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল।
ড্রয়িংরুমে পুরো পরিবার — আয়েশা বেগম, রহমত উল্লাহ সাহেব মাঝের দরজায় ধরে দাঁড়িয়ে, মাশরাফি দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে।
তুলি।
তুলি মেঝেতে বসে। কান্নারত।
আদিয়ান তার দিকে এগিয়ে গেল।
"কী হয়েছে?"
তুলি মাথা তুলল। তার চোখ ভেজা, কিন্তু কণ্ঠ অদ্ভুতরকম স্থির।
"আপু চিৎকার করল — মা বলে। তারপর আর কোনো শব্দ নেই।"
সে একটু থামল।
"আমরা ঘরে গেলাম। দরজা খোলা। জানালা ভাঙা।"
তার গলা একটু কাঁপল।
"আপু নেই।
নিস্তব্ধতা।
আদিয়ান রুহির ঘরের দিকে হাঁটল।
দরজা সত্যিই খোলা।
জানালার কাঁচ বাইরে থেকে ভেঙেছে — না ভেতর থেকে?
সে মেঝেতে তাকাল। ল্যাপটপ পড়ে আছে। ডায়েরির পাতা ছড়ানো — বাতাসে নয়, ছুঁড়ে দেওয়ার মতো করে।
এবং জানালার পাশে — একটি সরু দাগ। মেঝেতে।
কারো জুতার দাগ। কিন্তু রুহির জুতা টেবিলের পাশে রাখা।
আদিয়ান সেই দাগের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ঘুরল।
(#পর্ব_২২) — সন্দেহ ও সংঘাত
মাশরাফি এগিয়ে এলো।
তার চোখে সেই সন্দেহ এখন আর চোখে নেই — সারা মুখে ছড়িয়ে পড়েছে।
সে আদিয়ানের কলার চেপে ধরল।
"তুই নিয়ে গেছিস ওকে।" তার কণ্ঠ কাঁপছে — রাগে নয়, ভয়ে। সেই ভয়ের রাগ। "তোর বাবার মতো তুইও পিশাচ। বল, রুহি কোথায়?"
আদিয়ানের চোখে আগুন জ্বলে উঠল।
এক ঝটকায় মাশরাফির হাত সরাল। তারপর তার গালে এমন একটা থাবা পড়ল যে সে ছিটকে গিয়ে দেয়ালে পড়ল।
ঘরে একটা ভারী নিস্তব্ধতা।
আদিয়ান নিজেকে সামলাল। কয়েক সেকেন্ড।
তারপর চিৎকার করল — কিন্তু সেই চিৎকারে রাগের চেয়ে বেশি ছিল এক তীব্র অস্থিরতা।
"আমি যদি ওকে নিতে চাইতাম, লুকোচুরি করতাম না। সবার সামনে দিয়ে নিয়ে যেতাম।
মাশরাফি দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে। তার চোয়াল শক্ত।
কিন্তু তার চোখে — একটা বিচিত্র ভাব। যেন সে আদিয়ানকে বিশ্বাস করতে চাইছে, কিন্তু তার জানা কোনো একটা তথ্য তাকে সেটা করতে দিচ্ছে না।
আদিয়ান ঘর থেকে বেরিয়ে এলো।
বাইরে রাস্তায় দাঁড়াল।
শহরের রাত তার চারদিকে। গাড়িগুলো দূরে। মানুষ নেই এই গলিতে।
তার মাথায় তিনটি প্রশ্ন ঘুরছে।
একটা — এটা কি আফজাল খানের কাজ? রুহি ল্যাবের বাইরে গেছে শুনে তিনি নিজের মতো করে সরিয়ে নিলেন?
এটা কি আরাত্রিকার কারসাজি? আদিয়ান রুহিকে ভালোবাসে ভেবে রুহিকে সরিয়ে দিতে চাচ্ছে? আরাত্রিকা.
এটা কি রুহি নিজে?
সতাকে বিশ্বাস করে এখানে আনল। সে কি সেই বিশ্বাস ব্যবহার করে ডেটাবেস মুছে দিয়ে পালাল? ভেতর থেকে সিস্টেম হ্যাক করার সাধ্য তার আছে — এটা আদিয়ান জানে।
সে গাড়িতে উঠল।
স্টিয়ারিং ধরল।
তারপর থামল।
ড্যাশবোর্ডের আলোয় একটা ছোট্ট জিনিস চকচক করছে।
সে হাত বাড়াল।
একটি ছোট্ট চিপের টুকরো।
ভাঙা। কিন্তু এই চিপের গায়ে একটা চিহ্ন খোদাই করা
**☆ N-001
আদিয়ানের হাত স্থির হলো।
নেবুলা।
এই চিপ রুহির ল্যাবের ছিল না। এই চিপ তার প্রকোষ্ঠের সার্ভারে ছিল — গভীরে, লুকানো। যার অস্তিত্ব পৃথিবীতে মাত্র দুজন জানত।
একজন সে।
অন্যজন — যে বিশ বছর আগে সেই রাতে ক্যামেরার লেন্সের ওপাশে দাঁড়িয়ে ছিল। যে সেই ফুটেজ এনক্রিপট করে রেখেছিল। যে 'সঠিক সময়ের' অপেক্ষায় মিলিয়ে গিয়েছিল অন্ধকারে।
সেই মানুষটা এখনো বেঁচে আছে।
এবং সে রুহিকে জানে।
আদিয়ানের বুকে একটা হিমশীতল উপলব্ধি নামল।
রুহিকে কেউ অপহরণ করেনি।
রুহিকে কেউ ডেকে নিয়েছে।
কিন্তু কে — এবং কেন — সেই উত্তর এই অন্ধকারে নেই।
সে ইঞ্জিন চালু করল।
মনে মনে বলল —
তোকে খুঁজব। সুরক্ষার জন্য হোক — বা সত্য জানার জন্য হোক।
কিন্তু এই শহরে যে অন্ধকার তোকে গ্রাস করতে চাইছে।
সেই অন্ধকারের চেয়ে আমি বেশি গভীর।
গাড়ি চলল।
রাতের শহরে।
একটা মানুষের দিকে। যে হয়তো তার শত্রু।
অথবা — এই পুরো গল্পের একমাত্র মানুষ যে সত্যিটা জানে।
হয়তো বিশ্বাস ভেঙে পড়েনি।
হয়তো বিশ্বাস এমন একটা পথে গেছে
যেটা পৌঁছানোর আগে বোঝা যায় না।
[ চলবে ]
চতুর্থ অধ্যায় : বিশ্বাসের ব্যবচ্ছেদ।
✍️ লেখনীতে: আব্দুল্লাহ আল মিজান
━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━
বিশ্বাস হলো সেই কাঁচের দেয়াল ৺
যার ওপার থেকে সবকিছু স্পষ্ট দেখা যায়,
কিন্তু একবার ফাটল ধরলে —
সবকিছুই হয়ে যায় ঝাপসা এবং ধারালো।
আর সবচেয়ে ভয়ংকর সত্য হলো —
ফাটলটা কখনো বাইরে থেকে আসে না।
আসে ঠিক ভেতর থেকে।
(#পর্ব_১৮) — একটি আরজি
ল্যাবরেটরির কৃত্রিম আলো বিকেলেও রাতের মতো একরকম থাকে।
সকালের মতো ঠান্ডা, রাতের মতো নির্জন। বাইরে পৃথিবী কতটুকু আলোকিত বা অন্ধকার — এই ঘরের দেয়াল সেটা জানতে দেয় না। যেন এই ল্যাব একটা আলাদা মহাবিশ্ব — যেখানে সময় কেবল কাজের ভেতরে বয়, অনুভূতির ভেতরে নয়।
রুহি স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু স্ক্রিনে কী লেখা তা সে দেখছে না।
সে দেখছে বাবার মুখ। ইজিচেয়ারে বসা সেই ম্লান হাসি। মায়ের জায়নামাজে নত মাথা। তুলির সেই শূন্য দৃষ্টি।
কতদিন হলো?
সে গণনা করতে গিয়ে থামল। গণনা করলে আরও কষ্ট হয়।
দরজার যান্ত্রিক শব্দ।
রুহি চেয়ার ঘুরিয়ে দাঁড়াল — এবং থামল। তার চোখে একটা অদ্ভুত ভাব। সেই ভাব সাধারণত থাকে না। জেদ নেই, আগুন নেই — আছে এমন কিছু যা অনেক শক্তিশালী মানুষও মাঝে মাঝে লুকিয়ে রাখতে পারে না।
আর্তি।
আদিয়ান ঢুকে ফাইল রাখতে গেল টেবিলে।
খান সাহেব।
সে থামল। রুহির কণ্ঠ আজ অন্যরকম। সেই ধারালো ভাব নেই।
রুহি একটু এগিয়ে এল।
আমি অনেকদিন ধরে এই চার দেয়ালের ভেতরে আছি। বাবা কেমন আছেন, মা ঠিকঠাক ঘুমাচ্ছেন কি না, তুলি কীভাবে দিন পার করছে — এইটুকু নিজের চোখে দেখতে চাই।" একটু থামল। "আজ কি একবার বাসায় যেতে পারব? কাল সকালের আগেই ফিরে আসব। আপনার কথার বাইরে একটাও পা ফেলব না।"
তারপর আস্তে যোগ করল — "প্লিজ।"
এই একটা শব্দ।
রুহির মুখে এই শব্দটা আগে কেউ শোনেনি। সে অনুরোধ করে না, দাবি করে। সে মাথা নোয়ায় না, সোজা থাকে।
আজ সে বলল — প্লিজ।
আদিয়ান তার মুখের দিকে তাকাল।
তার চোয়াল শক্ত হলো।
"বাইরে তোমার জন্য নিরাপদ নয়, রুহি।" তার কণ্ঠ শান্ত, কিন্তু ভেতরে কোনো একটা হিসেব চলছে। "এটা তুমি জানো।"
"আমি জানি।" রুহির চোখ নামল না। "কিন্তু আমার নিরাপত্তার নামে আমার পরিবার থেকে আমাকে বিচ্ছিন্ন রাখা — সেটাও কি এক ধরনের বন্দিত্ব নয়?"
নিস্তব্ধতা।
আদিয়ান সেই চোখে কিছু একটা খুঁজল — সন্দেহ, কৌশল, অভিনয়? কিছুই পেল না। শুধু পেল একটা মানুষের সত্যিকারের ক্লান্তি। যে ক্লান্তি মিথ্যা হয় না।
দীর্ঘশ্বাস।
"ঠিক আছে।" তার গলা নিচু। "আমি নিজে পৌঁছে দেব। এবং কাল সকালে নিজে নিয়ে আসব। এই মাঝের সময়টায় আমার বিশ্বাসের অমর্যাদা যেন না হয়।"
রুহি কিছু বলতে গেল।
আদিয়ান আগেই ঘুরে গেল।
কিন্তু দরজার কাছে গিয়ে এক মুহূর্ত থামল — রুহি দেখল না — তার হাতের আঙুলগুলো দরজার ফ্রেমে একবার চেপে বসল। তারপর ছেড়ে দিল।
বেরিয়ে গেল।
ল্যাবের কৃত্রিম আলো একই রকম জ্বলতে থাকল। কিন্তু রুহির বুকে — সেখানে কিছু একটা উষ্ণ হলো। তারপরই ঠান্ডা।
সে নিজেকে মনে করিয়ে দিল —
এটা সুযোগ। এর বেশি কিছু নয়।*
---
(#পর্ব_১৯) — যাত্রাপথ ও সতর্কবার্তা।
ঢাকার সন্ধ্যা তার চিরচেনা কোলাহলে নেমে এসেছে।
রিকশার ঘণ্টা। হকারের ডাক। দোকানের আলো রাস্তার জলে মিশে এক অদ্ভুত রঙ তৈরি করেছে — যেন শহর নিজেই কোনো অস্পষ্ট স্বপ্নের ভেতর বাস করছে।
গাড়ির ভেতরটা সেই শহর থেকে আলাদা। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত, নিঃশব্দ। রুহি জানালার দিকে তাকিয়ে আছে। আদিয়ান স্টিয়ারিং ধরে।
দুজনের মাঝখানে একটা দূরত্ব — কিন্তু সেই দূরত্বে এমন একটা টান, যা দূরত্বকে অর্থহীন করে দেয়।
আদিয়ান বলল না বলা কথাটা।
"রুহি।"
সে জানালা থেকে চোখ না সরিয়েই বলল, "বলুন।"
"আমার পরিবারের বিরুদ্ধে একা কিছু করার চেষ্টা করো না।"
রুহি এবার তাকাল।
আদিয়ানের চোখ রাস্তায়। কিন্তু তার কণ্ঠে এমন একটা ভার আছে যা সাবধানবাণী পার হয়ে অনুরোধের কাছাকাছি চলে গেছে।
"আমার বাবা যতটা ভয়ংকর হতে পারেন — তুমি তা কল্পনাও করতে পারবে না। আমি তোমাকে বিশ্বাস করে আজ নিয়ে যাচ্ছি। এই বিশ্বাসটুকু বজায় রেখো।"
রুহির ঠোঁটে একটা বাঁকা হাসি এলো — কিন্তু চোখে এলো না।
"বিশ্বাস।" সে শব্দটা আস্তে উচ্চারণ করল। "আপনার নজরদারির ক্যামেরা কি বিশ্বাস করে? নাকি আমার ঘরের কোণে বসানো সেই লেন্সও বিশ্বাসের অংশ?"
আদিয়ানের হাত স্টিয়ারিংয়ে একটু বেশি শক্ত হলো।
জবাব দিল না।
কিন্তু তার চোয়ালে যে রেখা ফুটে উঠল — সেটা রাগের নয়। সেটা এমন কারো মুখের রেখা, যে জানে সে দোষী, এবং সেই দোষ স্বীকার করার পথটা তার কাছে নেই।
রুহি আবার জানালার দিকে ফিরল।
শহরের আলো তার চোখে পড়ল — ঝাপসা, দ্রুত বদলানো।
মনে মনে বলল —
আপনি আমাকে বিশ্বাসের কথা বলছেন। কিন্তু আমার বাবাকে যে বিষ দিয়েছিল — তার সাক্ষী আমি। সেই প্রমাণ এখন আমার কাছে। এই যাত্রায় কে কাকে বিশ্বাস করছে — সেই হিসাব এখনো মেলেনি।*
---
(#পর্ব_২০) — ঘরের কোণে অচেনা ছায়া।
পুরান ঢাকার সেই বাড়িতে পা রাখতেই রুহির বুকের ভেতর কোথাও একটা গিঁট খুলে গেল।
বেলিফুলের গন্ধ। পুরনো কাঠের গন্ধ। এবং সেই অস্পষ্ট গন্ধ — যা ঠিক চেনা যায় না, কিন্তু যা শুঁকলে মনে হয়, তুমি বাড়ি এসেছ।
মা দরজায় দাঁড়িয়েই কাঁদলেন।
রুহি মাকে জড়িয়ে ধরল — শক্ত করে। সেই শক্তে অনেক কথা ছিল যা মুখে বলা যায় না।
তুলি পেছন থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। "আপু।" একটাই শব্দ। কিন্তু সেই শব্দে একটা পুরো অভিমান।
রহমত উল্লাহ সাহেব বিছানায়। রুহি বাবার ঘরে গেল। বাবার হাত ধরল।
সেই হাত আগের চেয়ে হালকা মনে হলো।
কিন্তু বাবার চোখে একটা আলো এলো — যে আলো ওষুধে আসে না।
"মা এসেছিস।"
"এসেছি, বাবা।"
খাবার টেবিলে সেদিন রাতে সবাই একসাথে। রুহি সেই টেবিলে ইচ্ছে করেই কথা বলল আদিয়ানের বিষয়ে — ল্যাবের সুযোগ-সুবিধা, বাবার চিকিৎসার ব্যবস্থা, আদিয়ানের দেওয়া প্রতিশ্রুতি।
মা শুনলেন। তুলি শুনল।
কিন্তু একজন চুপ রইল।
মাশরাফি।
পাঁচ দিন আগে বিদেশ থেকে ফেরা রুহির খালাতো ভাই। বাড়ির বড় ছেলের মতো — মাথায় সংসারের ভার, চোখে সন্দেহের আলো।
সে থালা ঠেলে উঠে দাঁড়াল।
"রুহি, তুই কাদের কথা বলছিস বুঝছিস?"
রুহি হাসল।
"বুঝছি, ভাইয়া।"
"যে পরিবার তোর বাবাকে ধ্বংস করেছে —"
"ভুলটা আফজাল খানের। আদিয়ানের নয়।" রুহির কণ্ঠ শান্ত। "আর আমি কাউকে ক্ষমা করছি না। শুধু বাবাকে বাঁচাতে চাইছি। আফজাল খানের শাস্তি হবে — সেটাও হবে। কিন্তু এই মুহূর্তে আদিয়ান আমার পাশে আছেন। এটুকু আমি জানি।"
মাশরাফি আর বলল না।
কিন্তু তার চোখের কোণে সেই সন্দেহ — যা কথায় থামে, কিন্তু মেলায় না।
টেবিলে তুলি একটু হাসল। মা রুহির হাতে হাত রাখলেন।
কিন্তু রুহি টের পেল — মাশরাফির চোখে যা আছে, তা শুধু সন্দেহ নয়। তার চেয়ে কিছু গভীর।
যেন সে কিছু জানে।
যা রুহি এখনো জানে না।
(#পর্ব_২১) — স্তব্ধ স্ক্রিন ও আর্তনাদ।
রাত গভীর হলো।
আদিয়ান তার প্রকোষ্ঠে বসে।
মনিটরের আলোয় তার মুখ নীলচে। সে কাজ করছে না। শুধু সেই একটা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছে — যেখানে পুরান ঢাকার সেই বাড়ির একটি ঘর।
রুহির ঘর।
জানালায় হালকা আলো। সে টেবিলে বসে কিছু লিখছে। ডায়েরি।
আদিয়ান এক মুহূর্তের জন্য মনে মনে ভাবল — কী লিখছে?
তারপর নিজেই ঝেড়ে ফেলল সেই ভাবনা।
তার কাজ তাকে পাহারা দেওয়া। জানার অধিকার তার নেই।
তারপর — মনিটর ঝিলিক দিল।
একবার।
দুবার।
তারপর সম্পূর্ণ কালো।
আদিয়ান সোজা হলো।
এই সিস্টেম কখনো বন্ধ হয় না। এই প্রকোষ্ঠের সংযোগ তিনটি আলাদা সার্ভারে — একটি ব্যর্থ হলে দুটো সক্রিয় থাকে। তিনটি একসাথে বন্ধ হওয়ার একটাই মানে।
কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে বন্ধ করেছে।
ভেতর থেকে।
আদিয়ান রিবুট করার চেষ্টা করল। সার্ভার সাড়া দিল না। তারপর স্ক্রিনে একটা লাইন ফুটে উঠল —
DATA DELETION IN PROGRESS. 00:47 REMAINING.
আদিয়ানের সারা শরীরে একটা শীত নামল।
কেউ শুধু সংযোগ বন্ধ করেনি — কেউ তার পুরো ডেটাবেস মুছে দিচ্ছে।
সেই ডেটাবেসে — রুহির গবেষণার অংশ আছে। রহমত উল্লাহর পুরনো ফর্মুলার টুকরো আছে। এবং আরও কিছু আছে — যা এই পৃথিবীতে মাত্র দুজন জানে।
আদিয়ান চেয়ার ছেড়ে উঠল।
গাড়ির চাবি।
দরজা।
শহরের রাত তাকে গ্রাস করল।
---
পুরান ঢাকার গলিতে তার গাড়ি যখন থামল, বাড়ির বাইরে থেকেই একটা শব্দ ভেসে এলো।
কান্নার শব্দ।
আদিয়ান দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল।
ড্রয়িংরুমে পুরো পরিবার — আয়েশা বেগম, রহমত উল্লাহ সাহেব মাঝের দরজায় ধরে দাঁড়িয়ে, মাশরাফি দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে।
তুলি।
তুলি মেঝেতে বসে। কান্নারত।
আদিয়ান তার দিকে এগিয়ে গেল।
"কী হয়েছে?"
তুলি মাথা তুলল। তার চোখ ভেজা, কিন্তু কণ্ঠ অদ্ভুতরকম স্থির।
"আপু চিৎকার করল — মা বলে। তারপর আর কোনো শব্দ নেই।"
সে একটু থামল।
"আমরা ঘরে গেলাম। দরজা খোলা। জানালা ভাঙা।"
তার গলা একটু কাঁপল।
"আপু নেই।
নিস্তব্ধতা।
আদিয়ান রুহির ঘরের দিকে হাঁটল।
দরজা সত্যিই খোলা।
জানালার কাঁচ বাইরে থেকে ভেঙেছে — না ভেতর থেকে?
সে মেঝেতে তাকাল। ল্যাপটপ পড়ে আছে। ডায়েরির পাতা ছড়ানো — বাতাসে নয়, ছুঁড়ে দেওয়ার মতো করে।
এবং জানালার পাশে — একটি সরু দাগ। মেঝেতে।
কারো জুতার দাগ। কিন্তু রুহির জুতা টেবিলের পাশে রাখা।
আদিয়ান সেই দাগের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ঘুরল।
(#পর্ব_২২) — সন্দেহ ও সংঘাত
মাশরাফি এগিয়ে এলো।
তার চোখে সেই সন্দেহ এখন আর চোখে নেই — সারা মুখে ছড়িয়ে পড়েছে।
সে আদিয়ানের কলার চেপে ধরল।
"তুই নিয়ে গেছিস ওকে।" তার কণ্ঠ কাঁপছে — রাগে নয়, ভয়ে। সেই ভয়ের রাগ। "তোর বাবার মতো তুইও পিশাচ। বল, রুহি কোথায়?"
আদিয়ানের চোখে আগুন জ্বলে উঠল।
এক ঝটকায় মাশরাফির হাত সরাল। তারপর তার গালে এমন একটা থাবা পড়ল যে সে ছিটকে গিয়ে দেয়ালে পড়ল।
ঘরে একটা ভারী নিস্তব্ধতা।
আদিয়ান নিজেকে সামলাল। কয়েক সেকেন্ড।
তারপর চিৎকার করল — কিন্তু সেই চিৎকারে রাগের চেয়ে বেশি ছিল এক তীব্র অস্থিরতা।
"আমি যদি ওকে নিতে চাইতাম, লুকোচুরি করতাম না। সবার সামনে দিয়ে নিয়ে যেতাম।
মাশরাফি দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে। তার চোয়াল শক্ত।
কিন্তু তার চোখে — একটা বিচিত্র ভাব। যেন সে আদিয়ানকে বিশ্বাস করতে চাইছে, কিন্তু তার জানা কোনো একটা তথ্য তাকে সেটা করতে দিচ্ছে না।
আদিয়ান ঘর থেকে বেরিয়ে এলো।
বাইরে রাস্তায় দাঁড়াল।
শহরের রাত তার চারদিকে। গাড়িগুলো দূরে। মানুষ নেই এই গলিতে।
তার মাথায় তিনটি প্রশ্ন ঘুরছে।
একটা — এটা কি আফজাল খানের কাজ? রুহি ল্যাবের বাইরে গেছে শুনে তিনি নিজের মতো করে সরিয়ে নিলেন?
এটা কি আরাত্রিকার কারসাজি? আদিয়ান রুহিকে ভালোবাসে ভেবে রুহিকে সরিয়ে দিতে চাচ্ছে? আরাত্রিকা.
এটা কি রুহি নিজে?
সতাকে বিশ্বাস করে এখানে আনল। সে কি সেই বিশ্বাস ব্যবহার করে ডেটাবেস মুছে দিয়ে পালাল? ভেতর থেকে সিস্টেম হ্যাক করার সাধ্য তার আছে — এটা আদিয়ান জানে।
সে গাড়িতে উঠল।
স্টিয়ারিং ধরল।
তারপর থামল।
ড্যাশবোর্ডের আলোয় একটা ছোট্ট জিনিস চকচক করছে।
সে হাত বাড়াল।
একটি ছোট্ট চিপের টুকরো।
ভাঙা। কিন্তু এই চিপের গায়ে একটা চিহ্ন খোদাই করা
**☆ N-001
আদিয়ানের হাত স্থির হলো।
নেবুলা।
এই চিপ রুহির ল্যাবের ছিল না। এই চিপ তার প্রকোষ্ঠের সার্ভারে ছিল — গভীরে, লুকানো। যার অস্তিত্ব পৃথিবীতে মাত্র দুজন জানত।
একজন সে।
অন্যজন — যে বিশ বছর আগে সেই রাতে ক্যামেরার লেন্সের ওপাশে দাঁড়িয়ে ছিল। যে সেই ফুটেজ এনক্রিপট করে রেখেছিল। যে 'সঠিক সময়ের' অপেক্ষায় মিলিয়ে গিয়েছিল অন্ধকারে।
সেই মানুষটা এখনো বেঁচে আছে।
এবং সে রুহিকে জানে।
আদিয়ানের বুকে একটা হিমশীতল উপলব্ধি নামল।
রুহিকে কেউ অপহরণ করেনি।
রুহিকে কেউ ডেকে নিয়েছে।
কিন্তু কে — এবং কেন — সেই উত্তর এই অন্ধকারে নেই।
সে ইঞ্জিন চালু করল।
মনে মনে বলল —
তোকে খুঁজব। সুরক্ষার জন্য হোক — বা সত্য জানার জন্য হোক।
কিন্তু এই শহরে যে অন্ধকার তোকে গ্রাস করতে চাইছে।
সেই অন্ধকারের চেয়ে আমি বেশি গভীর।
গাড়ি চলল।
রাতের শহরে।
একটা মানুষের দিকে। যে হয়তো তার শত্রু।
অথবা — এই পুরো গল্পের একমাত্র মানুষ যে সত্যিটা জানে।
হয়তো বিশ্বাস ভেঙে পড়েনি।
হয়তো বিশ্বাস এমন একটা পথে গেছে
যেটা পৌঁছানোর আগে বোঝা যায় না।
[ চলবে ]
পঞ্চম অধ্যায় কবে আসবে
উত্তরমুছুন👌😻
উত্তরমুছুন